গভীর ব্যঞ্জনাবাহী ও রোমান্টিক আবহে অনুরক্ত ‘তুমি ছাড়া শূণ্য আমি’
০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৩১ পিএম
তাঁকে আমি ইংরেজি পত্র-পত্রিকার কলামিস্ট হিসাবে চিনি, নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে দেখি। আবার দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে জলবায়ু, পরিবেশ আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করতে দেখি। তবে তিনি এত কিছুর পরও যে কবিতার চর্চা করেন, তা আমি কভু জানতাম না যদি তার প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তুমি ছাড়া শূণ্য আমি’ না পড়তাম। হ্যাঁ, তারুণ্যের প্রতীক, মুক্তমণা ও একজন দেশপ্রেমিক পারভেজ বাবুলের প্রসঙ্গে বলছিলাম। ‘বলাকা প্রকাশন’ থেকে একুশে বইমেলায় (২০১৮) তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশ পায়। ইতোপূর্বে তাঁর চারটি ইংরেজি বই প্রকাশ হয়েছিল। সবকিছু ব্যতিরেখে, তার কবিতাগুলো যে বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য, অনন্য সৃষ্টিকর্ম তা স্বীকার্য।
পারভেজ বাবুল তাঁর রচিত ‘তুমি ছাড়া শূণ্য আমি’ গ্রন্থটিতে মোট ৫৫ টি কবিতা সংযোজন করেছেন যার অধিকাংশ গদ্য ছন্দে রচিত। কবিতায় ভাষা ব্যবহারে যেমন সহজবোধ্যতা দেখিয়েছেন, তেমনি কবিতার সাথে তিনি যেন বিভিন্ন চরিত্রে গল্প করেছেন। একজন পাঠকমাত্রই তার কবিতাগুলো প্রাথমিক বিচারে ভাল লাগার তালিকায় লিপিবদ্ধ করবেন। ‘তুমি ছাড়া শূণ্য আমি’ কবিতার মাধ্যমে কবি তাঁর একটি আবেগময় মুহূর্ত্বকে সম্মুখে এনেছেন। কাউকে পাওয়ার প্রতীক্ষায় জীবনের সমাপ্ত ঘটিয়েছেন। কিন্তু পাওয়া হয়নি বলে কবিতায় লিখেছেন, ‘অবশেষে বুঝলাম, তুমি আমার নও।’ লেখকের জীবনের সমাপ্ত না ঘটিয়ে যদি আমরা আরেকটি কবিতার দিকে নজর দেই, তাহলে বোঝা যাবে কবি মন কতটা ব্যথাতুর! ‘কাউকে ভালোবাসতেও ভয় হয়’ কবিতার মাধ্যমে তার যথার্থতা ব্যক্ত করেছেন। কবি যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত, তখন সুখের সন্ধান করেছেন। ‘একটু সুখ চাই, দেবে?../ কাকে বলবো? আশেপাশে তেমন কেউ নেই! (একটু সুখ চাই)। কবি যথার্থই বলেছেন, ‘দুঃখের সময় কেউ পাশে থাকে না।’ এই কারণে ‘পৃথিবীতে মানুষ বেশি অসহায়’, যা তিনি এই শিরোনামের কবিতায় তুলে ধরেছেন। কি রুঢ় বাস্তবতা!
এত কিছুর পরও কবি বড়ই আশাবাদী। বিরহের আলিঙ্গন ছেড়ে লিখেছেন, ‘তুমি আমার বিশুদ্ধ যৌবনের কবিতা/ পরম প্রত্যাশিত একমাত্র প্রিয় মানুষ (তুমি যে আমার কবিতা)। শুধু তাই নয়, তিনি ভালবাসার জয়ের কথাও নিদারুণভাবে তুলে ধরেছেন। ‘তোমার নিখাদ ভালবাসা, গভীর অনুভূতির../ আমি বিশ্বাস করি (ভালোবাসার জয় হোক)। তাহলে কি কবি বারবার প্রেমে জড়িয়েছেন, বারবার মনের মানুষকে হারিয়েছেন। হয়তো এমন নয়! তবে তার কবিতার অনুভূতিগুলো অনেক কিছুই বয়ে নিয়ে বেঁড়ায়। নতুবা তিনি কখনই বলতে পারতেন না ‘আমার অভিধানের প্রচ্ছদে লিখে দেবো/ হাজার ফুলেরা ঈর্ষা করে করুক/ তুমি ফুলের চেয়েও সুন্দর (তুমি ফুলের চেয়েও সুন্দর)। আর তারপরই তিনি ভালোবাসাতেও গণতন্ত্রকে খুঁজেছেন। তিনি বুঝেছেন, ভালবাসলেও কেন হারাতে হয়? ‘আমি যাকে ভালোবাসবো তাকে পাওয়া/ আমার গণতান্ত্রিক অধিকার যেনো (ভালোবাসায় গণতন্ত্র থাকা উচিৎ)।’ কিন্তু আজবধি ভালোবাসায় কোনো গণতন্ত্র আমরা দেখিনি বলে সকল প্রেমিকই সেই কথাই বলে ‘তুমি ছাড়া শূণ্য আমি।’
কাব্যগ্রন্থটিতে প্রেম-বিরহের কবিতার পাশাপাশি আরও কিছু জীবনবোধের কবিতা স্থান পেয়েছে। কিছু কবিতার নারী প্রেমের অন্তরালে দেশপ্রেমের একচ্ছত্রতাও ফুঁটিয়ে তুলেছেন। কবি কবিতার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, একজন নারীকে ভালোবাসা আর দেশকে ভালোবাসা সমান। কিন্তু এই তত্ত্ব এখনও যাদের কানে পৌঁছায়নি তারাই মূলত প্রেম-ভালোবাসার নামে মানুষকে প্রতারিত করে। কবি এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। প্রেম-পূণ্যে তিনি জগৎটাকে ভরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। বইটির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা হল, ‘বেশতো আছি’, ‘কষ্ট যদি হয় জীবন সঙ্গি’, ‘আমি এক মুক্ত বিহঙ্গ’, ‘ছুটি’, ‘বন্ধুত্বের মুগদ্ধতায়’, ‘যদি পাখি হতাম’, ‘তুমি আমার লাল কৃষ্ণচূড়া’ ইত্যাদি।
পরিশেষে বইটি পাঠ করে মনে হয়েছে, কবি পারভেজ বাবুল কবিতার অমিয় শক্তি দ্বারা প্রেম-ভালবাসাকে পরিচ্ছন্নতার আবাসনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছেন। কবিতাগুলো বিভিন্ন বিখ্যাতের উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে আরেকটি অনুপ্রেরণার প্রসঙ্গ ব্যক্ত করেছেন যা পাঠককে ভাবনার উদ্বেক ঘটাবে। পারভেজ বাবুলের সুন্দর কবিতার বইটি বহুকাল বাংলা সাহিত্যে বিচরণ করুক, সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
তুমি ছাড়া শূণ্য আমি: পারভেজ বাবুল
প্রকাশকাল: অমর একুশে বইমেলা-২০১৮
প্রকাশনী: বলাকা প্রকাশন
মূল্য: ১৫০ টাকা
আইএসবিএন: ৯৭৮-৯৮৪-৯২৬১৩-৩-৯
















