o গুজরাট ও হিমাচলে ভোট গণনা শুরু, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত o আজ রাজশাহী মুক্ত দিবস o সাত ঘণ্টা পর ফেরি চলাচল শুরু o শিক্ষকরাই আসল প্রশ্নফাঁসকারী: শিক্ষামন্ত্রী o ২১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে রিহ্যাব মেলা

আজ সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

আপনি আছেন : প্রচ্ছদ  >  আন্তর্জাতিক  >  রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা অস্বীকার করল মিয়ানমার

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা অস্বীকার করল মিয়ানমার

পাবলিশড : ২০১৭-১০-১১ ১১:২৩:০১ এএম

।। আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।।

বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে সরকার আশ্বাস দিয়েছে বা কাজ শুরু করেছে- আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে আসা এমন সব খবর পুরোপুরি অস্বীকার করেছে দেশটি। মিয়ানমারের মন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা এসব প্রতিবেদনের তথ্য মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। ঢাকায় পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ইউ থান্ট কিয়াওয়ের সাক্ষাৎ ও আলোচনার পর থেকে বাংলাদেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, এমনকি মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমেও ফলাও করে প্রচার হচ্ছিল, মিয়ানমার আপাতত বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া দু’হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে। ২০০৫ সাল থেকে থেমে থাকা রোহিঙ্গা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এর মধ্য দিয়ে গতি পেতে যাচ্ছে বলে তখন আশা প্রকাশ করেছিলেন অনেকে। ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টার তার সম্পাদকীয়তে এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে একে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছিল। কিন্তু মিয়ানমার তাদের বক্তব্য অস্বীকার করে বুঝিয়ে দিলো, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন আলোচনার মধ্যে তৈরি ফাটলটা দিনদিন বড়ই হচ্ছে। তারা বারবারই বলছে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার কোনো কথাই নাকি হয়নি বাংলাদেশের সঙ্গে!

মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাংলাদেশ থেকে ২৪১৫ বার্মিজ নাগরিককে পুনর্বাসনের কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু ওই ‘রোহিঙ্গা’ নামটাতে গিয়েই যত আপত্তি তাদের। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর থেকেই এ ব্যাপারে বারবার গাইগুঁই করছেন কিয়াও। বলছেন, বৈঠকের সময় থেকেই বাংলাদেশি সচিব ও কর্মকর্তাদের ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহারের বিরোধী তিনি।

গত ৪ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিয়াও বলেন, ‘রোহিঙ্গা’ নামটার ব্যাপারে আমি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে ব্যাখ্যা করে আমাদের সাক্ষাতের সময় বুঝিয়েছি যে, মিয়ানমারের নৃ-গোষ্ঠীর আনুষ্ঠানিক তালিকা এবং আমাদের ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণ অনুসারে, ‘রোহিঙ্গা’ নামের কোনো নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী আমাদের নাগরিক কখনোই ছিল না।’ ইউ থান্ট কিয়াও সুর মেলাচ্ছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের অন্যতম পরিচালক ইউ জাও হ্তায়ের সঙ্গে, যিনি ২ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মুখের ওপর রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া বিষয়ক সংবাদগুলো মিথ্যা দাবি করে বলেছিলেন, যাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে তারা রোহিঙ্গা নয়।

‘আমাদের দু’দেশের মধ্যে এ ধরণের কোনো সমঝোতা হয়েছে, মিয়ানমার এমন ভ্রান্ত তথ্য কখনোই মেনে নেবে না, গণমাধ্যমে তারা যা-ই ঘোষণা করুক না কেন,’ বলেন হ্তায়, ‘ওই বৈঠকে মিয়ানমার তো শুধু ২০০৫ সালে পুনর্বাসনের ব্যাপারে আলোচনা হওয়া ২৪১৫ জন মানুষের ব্যাপারে খোঁজখবর করার জন্য একটি যৌথ কমিটি গঠনে সম্মত হয়েছে।’

এই ২৪১৫ জনকে যে ফিরিয়ে নেয়াই হবে, এটাও নিশ্চিত না বলেও জানান ইউ জাও হ্তায়। বরং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটির ব্যবহার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে বলে তিনি অনেকটা হুমকিই দিয়েছেন বলা চলে। আলোচিত এই ২৪১৫ জনকে ২০০৫ সালে মিয়ানমারের নাগরিক বলে সনাক্ত করেছিল দেশটির কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তখন তারা দেশে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। এর ফলে তখন আটকে গিয়েছিল পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। এতদিন পর মিয়ানমার সরকার অবশেষে বলছে ওই লোকগুলোকে তারা ফেরত নেবে যদি (!) তারা নতুন পরীক্ষায় নির্ধারিত ৪টি শর্ত পূরণ করতে পারে এবং তারপর যদি (!) তারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে যেতে আগ্রহী হয়।

নিধনের কথা স্বীকার করলো মিয়ানমারের মানবাধিকার কমিশন : রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের দেওয়া চিঠির জবাবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হত্যা ও নির্যাতনের কথা স্বীকার করেছে সেদেশের মানবাধিকার কমিশন। মিয়ানমারকে আলোচনার টেবিলে আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের সুপারিশ করেছে মানবাধিকার কমিশনের কমিশন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চলছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে নির্যাতনের শিকার ১০ লাখেরও বেশী রোহিঙ্গা। বাংলাদেশমুখী এই স্রোত এখনও অব্যাহত রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মিয়ানমরের মানবধিকার কমিশনকে গত ৮ সেপ্টেম্বর চিঠি দেয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ওই চিঠির জবাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের কারণ হিসেবে তাদের হত্যা ও নির্যাতনের কথা উল্লেখ করা হয়।
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন: যদিও তারা সবকিছু স্বীকার করতে চায় না, তবুও চিঠির জবাবে তারা স্বীকার করেছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন করার ফলে তারা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। অবশ্য মিয়ানমার সরকার বারবার বলতে চেষ্টা করেছে যে, তাদের ওখানে কোন নির্যাতন হচ্ছে না। গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমার পুলিশের উপর আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলাকে দেশটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে অন্তর্জাতিক তদন্তের সুপারিশ করেছে জাতীয় মানবধিকার কমিশন। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন: দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলেও কেবল মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।

ইউরোপীয় কাউন্সিলের বৈঠকে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান : পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বলি অব কাউন্সিল অব ইউরোপ-পেস এর বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনার জন্য দেওয়া তুরস্কের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রজার গেলকে উদ্ধৃত করে তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদুলু পোস্ট এই খবর জানিয়েছে। আনাদুলু পোস্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ইউরোপীয় কাউন্সিলের বৈঠকে ইউক্রেনের নতুন শিক্ষা আইন এবং কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা প্রশ্নে আলোচনা হয়। তবে তুরস্কের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধন নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। সোমবারের বৈঠক শুরুর সময় পেসের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রজার গেল জানান, তুরস্কের প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বলতে চাইলেও সাধারণ সভায় সেটা গ্রহণ করা হয়নি। আনাদুলু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর নিধনয্জ্ঞ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিল তুরস্ক। জাতিসংঘের মতে রোহিঙ্গারাই বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী । ২৫ আগস্টের সহিংসতার পর সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তাদের কাছ থেকে শোনা যায় সামরিক বাহিনীর চালানো নৃশংসতা ও নিপীড়নের বিবরণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলি বলেছেন ওই নিধনযজ্ঞে প্রায় ৩ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছে।

নির্যাতন বন্ধে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ৭ সুপারিশ : মিয়ানমারে চলমান রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ, তাদের জন্য বাফার জোন তৈরিসহ সাত দফা সুপারিশ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। এ ছাড়া কমিশনের পক্ষ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের কাছে ‘অনুপত্র’ দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এসব কথা বলেন। মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের জন্য বাফার জোন তৈরি করা, জাতিসংঘের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করা, বাংলাদেশে বসবাস করা ‘১০ লাখ’ রোহিঙ্গার মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক বাংলাদেশকে সহায়তা প্রদান, কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি না করে কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করে মিয়ানমার রাষ্ট্র কর্তৃক রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান করা, প্রয়োজনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক, অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে অবরোধ আরোপ করা এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে যে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে মৌলিক অধিকার বঞ্চিত করেছে, এসব কারণে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করা। সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, মিয়ানমারে গণহত্যার ঘটনা ঘটছে। সেখানে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় আসিয়ান, কমনওয়েলথ সচিবালয়ের মানবাধিকার–বিষয়ক ইউনিট, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) মহাসচিব, ইউনিসেফ,ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনসহ (আইওএম) আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে ‘অনুপত্র’ পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের পদ্ধতিগত সংস্কার করতে হবে। কারণ, সারা বিশ্বের সব রাষ্ট্র এক দিকে অবস্থান নেবে আর দু-একটি রাষ্ট্র অপরদিকে থাকবে, এটা হতে পারে না। এমন ধরনের ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন।

মিয়ানমারে গণহত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) দেশটির শাসকদের বিচার দাবি করে কাজী রিয়াজুল হক বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে দ্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) হামলা করেছে, নাকি মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে এমনটি ঘটানো হয়েছে, সেটা তদন্ত করে দেখা যেতে পারে। আর এই আরসা কারা, সেটাও দেখতে হবে। এভাবে একপেশে অভিযোগ দিয়ে গণহত্যা চালানোর দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিসি ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচার হতে পারে।

মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে মানবাধিকার কমিশন কথা বলবে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে কমিশন চেয়ারম্যান বলেন, মিয়ানমার সরকার মারমুখী অবস্থানে আছে। তারা কারও কথা শুনছে না। তবু কমিশনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে একটি ‘অনুপত্র’ দেওয়া হয়েছে। সে দেশের মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় কি না, সে চেষ্টাও তাঁরা করছেন।