o গুজরাট ও হিমাচলে ভোট গণনা শুরু, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত o আজ রাজশাহী মুক্ত দিবস o সাত ঘণ্টা পর ফেরি চলাচল শুরু o শিক্ষকরাই আসল প্রশ্নফাঁসকারী: শিক্ষামন্ত্রী o ২১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে রিহ্যাব মেলা

আজ সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

আপনি আছেন : প্রচ্ছদ  >  মতামত  >  রোহিঙ্গাদের ঘুরে দাড়ানো স্বাধীনতা যুদ্ধের ইঙ্গিত

রোহিঙ্গাদের ঘুরে দাড়ানো স্বাধীনতা যুদ্ধের ইঙ্গিত

পাবলিশড : ২০১৭-০৮-২৯ ১৭:১০:১৬ পিএম

।। মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার, পিএসসি, জি (অব:) ।।

গত ২৫আগস্টের আক্রমনটি ছিল মুক্তিকামী রোহিঙ্গাদের প্রথম ঐতিহাসিক সমন্বিত আক্রমন। আক্রমনের এইচ আওয়ার ছিল রাত ০১ ঘটিকা। একই সময়ে ৩০টি বার্মিজ পুলিশ পোষ্ট ও একটি সেনা চৌকিতেতারা সমন্বিত আক্রমন করে বসে রোহিঙ্গা গেরিলা বাহিনী। ধারনা করা হয় এতে ১১জন বার্মা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও ২১জন গেরিলা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছে। ১১জনের মধ্যে ১০জন ছিল পুলিশ এবং একজন সেনাসদস্য ছিল।

মূলত বার্মিজ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতি আক্রমন শুরু হয় গত অক্টোবর ২০১৩ থেকে। এর আগে গেরিলারা বাংলাদেশের একটি আনসার ক্যাম্প লুট করে। লুটকৃত অস্ত্রের সাহায্যে তারা অক্টোবরের আক্রমনটি রচনা করে। উক্ত সময়ে রোহিঙ্গাদের এই গেরিলাবাহিনীর নাম ছিল হারাকাহ আল-ইরাকিনবাফেইথ মুভমেন্ট। এই নামটির সংগে ধর্মীয় আবহ থাকার ফলে রোহিঙ্গা গেরিলারা এই নামটি পরিবর্তন করে রাখে আরাকা রোহিঙ্গা সেলভেশন আর্মি বা আরসা।

প্রথম আক্রমনটি শুরু হয় রাত একটার সময়। তারপর দ্বিতীয় আক্রমনটি হয় রাত ৩টায় এবং তৃতীয় আক্রমনটি পরিচালনা করা হয় রাত ৪টায়। আক্রমনে হাতে বানানো বোমা ও ক্ষুদ্রাস্ত্র ব্যাবহার করা হয়।

অক্টোবর ২০১৬আক্রমনের সংগে আগষ্ট ২০১৭এর আক্রমনের অনেক পার্থক্যদৃশ্যমান। অক্টোবর২০১৬ আক্রমনে বুথিডং প্রদেশের টংবাজার এলাকায় একটি সেনা চৌকিতে প্রায় ১৫০জন রোহিঙ্গা গেরিলা আক্রমন পরিচালনা করে। কিন্তু আগষ্ট ২০১৭আক্রমনে বুথি ডং ছাড়াও মংডুতেও আক্রমন রচনা করা হয়। প্রায় ১০০০রোহিঙ্গা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ৩১টি পোষ্টে একযোগে আক্রমন রচনা করে। ক্ষুদ্রাস্ত্রের পাশাপাশি গেরিলারা লাঠি ও তলোয়ার ব্যাবহার করে এবং বিস্ফোরক দিয়ে একটি সেতু উড়িয়ে দিয়েছে। আরসা’র বর্তমান নেতার নাম আতা-উল্লাহ। কিছুদিন আগেও রোহিঙ্গাদের অভিভাবকহীন সবচেয়ে নির্যাতিত মানুষ বলে ধরে নেওয়া হত। বর্তমানে তাদের নেতা হিসাবে আতা-উল্লাহ নামে একজন রুহিঙ্গার আবির্ভাব হয়েছে। আতা-উল্লাহর আরও ৩টি নাম রয়েছে। সেগুলো হল আবু আমরজুননী, আমির আবুওমর এবং হাফিজতোহার। হতে পারে এগলো তাঁর ছন্দনাম।

নির্যাতিত রুহিঙ্গারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আশ্রয় গ্রহন করেছে। তাদের একটি দল পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। আতা-উল্লাহর পিতা পাকিস্তানের করাচিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শিশুকাল আতা-উল্লাহকে তার পরিবার সৌদিআরবের মক্কায় নিয়ে যান।সেখানে একটি মাদ্রাসায় তাঁকে ভর্তি করা হয়।

২০১২সালে আতা-উল্লাহ মক্কা নগরি থেকে পুনরায় পাকিস্তান চলে আসেন। সে বৎসর ৮জুন ২০১২সালে রায়ট শুরু হয়, ইতিহাসে যাকে “২০১২রাখাইন স্টেট রায়ট” নামে অভিহিত করা হয়। সে রায়টে প্রায় এক শতের মত রুহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছিল। প্রায় এক লক্ষ রুহিঙ্গা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল।

খুব সম্ভবত: ২০১২সালের এই রায়টই আতা-উল্লাহ্কে রুহিঙ্গাদের নেতৃত্বে আসার জন্য প্রেরণা দেয়। পাকিস্তানের তালিবানরা প্রাথমিকভাবে আতা-উল্লাহ্কে গেরিলাযুদ্ধে প্রশিক্ষন প্রদান করে। পরবর্তীতে আতা উল্লাহ্কে আরও উচ্চতর প্রশিক্ষনের জন্য লিবিয়ায় পাঠানো হয়।

প্রায় ৪ বৎসর কঠোর গেরিলা প্রশিক্ষনের পর ২০১৬সালের কোন এক সময় তাকে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে পাঠানো হয়।

গেরিলা যোদ্ধাদের নেতা হিসাবে আতা-উল্লাহ্’র জন্য ০৯অক্টোবর ২০১৬ ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জিং দিন। সেদিন ছিল রবিবার। রাত ঠিক ১টা ৩০মিনিটে ৯০জন গেরিলা যোদ্ধা আতা-উল্লাহ্’র নেত্রিত্ত্বে মংডু শহরের কাইবানগিন গ্রামে অবস্থিত একটি পুলিশ পোষ্টে আক্রমন করে বসে। এই আক্রমনে ০৬জন পুলিশ অফিসার নিহত হয়। আরও ০২জন আহত হয়। গেরিলারা এই আক্রমনে ৫১টি অস্ত্র লুট করে নিয়ে যায়। প্রায় ১০হাজারের মত গুলি নিয়ে যায়। ঠিক একই সময় রাথিডং শহরে কাইডাংগক গ্রামেও আরও একটি আক্রমন রচনা করা হয়েছিল। আর রাত ৪টা ৩০মিনিটে ৩য় আক্রমনটি রচনা করা হয়েছিল বুথিডং এ।

এই আক্রমনের সফলতা খুব সম্ভবত: আতা উল্লাহ্কে আরও উৎসাহী করে তুলে। প্রায ০৯মাস ধরে নিঃস্বন্দেহে তারা অনেক অনেক প্রস্তুতি ও রেকি সম্পন্ন করেছিল। তারই ফলে হল আজকের এই ২৪আগষ্টের আক্রমন।

অক্টোবর ২০১৬এর আক্রমন থেকে আগষ্ট ২০১৭আক্রমনটিতে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। এই পার্থক্যগুলো নিঃস্বন্দেহে অর্থ পূর্ন ও ইঙ্গিতবহ। এগুলো হতে পারে (১) এটা ছিল রিটালিয়েশন, যা ছিল অনিবার্য। কারন সকল মুক্তিযুদ্ধ এমনি করেই শুরু হয়, (২) এ যুদ্ধ চুড়ান্ত বিজয়ের আগ পর্যন্ত থেমে যাবার কথা নয়। এই আক্রমনের পর রোহিঙ্গা বৃদ্ধ, শিশু ও মহিলারা বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হলেও, যুবকরা কিন্তু ফিরে আসে নি। তারা যুদ্ধরত আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। (৩) বার্মিজরা এই প্রথমবারের মত বাঙ্গালী শব্দটি ব্যবহার করেছে। তারা বলেছে “বাঙ্গালীসন্ত্রাসীরা” এই আক্রমন রচনা করেছে। এটা আমাদের জন্য হানিকর মন্তব্য। এটার সমুচিত জবাব এখন সময়ের দাবি। ইতিমধ্যে ডিজিবিজিবি সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বার্মার নিরাপত্তা বাহিনীর কোন গুলি আসলে তার সমুচিত জবাব দেয়া হবে বলে তিনি হুশিয়ার করে দিয়েছেন। (৪) আতা-উল্লাহ্’র সংগে আরও ২০জন প্রশিক্ষিত গেরিলা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে তাদের সাথে আছে জিয়াবুর রহমান নামে একজন সৌদি আরবের রোহিঙ্গা মুফতি। (৫) অতিতের চেয়েও আরও বেশি সংগঠিত এবং তাদের ফান্ডের অবস্থা ভাল। ধারণা করা হচেছ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইত্যাদি দেশ থেকে তারা সাহায্য পেয়ে থাকে। (৬) আর সাতাদেরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মানতে নারাজ। তারা এখনও কোন বেসামরিক কিংবা ধর্মীয় উপসনালয় আক্রমন করেনি। (৭) আরসারএকটিই প্রধান উদ্দেশ্য আর তা হল বার্মার ভিতরে নিজেদেরকে নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অধিকার আদায় করা।

ভবিষ্যতে বার্মা-বাংলাদেশের উপর অনেক মিথ্যা অভিযোগ আনতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। যেকোন গেরিলাযুদ্ধের জন্য ০৩টি সহায়তা খুবই প্রয়োজন। সেগুলো হল (১) নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় সেফ হেভেন (২) অস্ত্র সরবরাহ (৩) গেরিলা যুদ্ধের উপর প্রশিক্ষন। বার্মা সরাসরি রোহিঙ্গাদের এসব প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উপর মিথ্যা অভিযোগ আনতে পারে। সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

বর্তমানে রোহিঙ্গা গেরিলারা লুটের অস্ত্র ব্যবহার করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সেফ হেভেন হিসাবে তারানো-ম্যানস্্ল্যান্ড, বিশেষ করে ভারত ও মায়ানমার সীমান্তে ভারতের বিছিন্নতাবাদিদের কর্তৃক ব্যবহৃত ভ’মি ব্যবহার করতে পারে।

রোহিঙ্গাদের নাগরিগত্ব সনদ না দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কক্সবাজার এলাকায় রেড এলার্ট ইতি মধ্যে জারি করেছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিত্ব প্রদানের কোন প্রশ্নই আসে না। আমি যখন ইরাকে জাতিসংগ মিশনে ছিলাম তখন দেখেছি সাদ্দাম হোসেন সরকার অন্য দেশের নাগরিকদের নাগরিকত্ব দিলেও ফিলিস্তিনদের নাগরিকত্ব দিত না। তাঁর মতে ফিলিস্তিনরা তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাবে। সুতরাং রোহিঙ্গারাও প্রয়োজনে যুদ্ধ করে নিজ দেশে ফেরত যাবে এটাই অভিজ্ঞ মহল মনে করে। আর তারই ফলশ্রুতিতে শুরু হল যেন “আরকান মুক্তি যুদ্ধ”। এ চুড়ান্ত বিজয় আনয়নের আগ পর্যন্ত এ যুদ্ধ শেষ হবে না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।