o অভিনব কায়দায় গ্যাস সিলিন্ডারে ফেন্সিডিল পাচার; গ্রেফতার ১ o মাটিরাঙ্গাতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত o নাচোলে কারেন্ট পোকা দমনে সচেতনা মুলক সভা অনুষ্ঠিত o শিবগঞ্জে আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মলীগের ১১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত o কানসাটের ২ প্রতিষ্ঠানে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়

আজ মঙ্গলবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ |

আপনি আছেন : প্রচ্ছদ  >  মতামত  >  স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং আমরা রিফিউজি ।। এক ।।

স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং আমরা রিফিউজি ।। এক ।।

পাবলিশড : ২০১৭-০৭-২২ ২১:০৭:১৮ পিএম আপডেট : ২০১৭-০৭-২২ ২১:২৭:২৪ পিএম

।। ইমরান আহমেদ চৌধুরী ।।

ধজনগর নামে একটা গ্রামে বিকাল বেলায় আশ্রয় নিলাম। ইমাম বাড়ি স্টেশন দিয়ে রেললাইন পার হয়ে গোপীনাথপুর তারপর আমাদের গ্রামের বাড়ীর উপর দিয়ে হেটে চিনাইর নদী পার হলাম। ভয়ে একবারও গ্রামের সেই পুরোনো বাড়িটার কাছে যাওয়ার সাহস হলনা ভাইজান এবং আমাদের দলের অন্যান্যদের। মুসল ধরে বৃষ্টি, গায়ে সুইয়ের মতো ফুটছে বৃষ্টির বড় বড় ফোটা গুলো। পথ আর কত তা জানিনা। মান্দার পুর, সয়দাবাদ উজানিশাহার ব্রীজ এবং সিএনবি রড স্থান গুলো আর্মী কনভয় রাজাকারদের প্রহরায়। 

ঐ এলাকা গুলো খুব সতর্কতার সাথে পার হয়ে আমরা একটা স্কুলে আশ্রয় নিলাম। এই অবিরাম বৃষ্টি থেকে রেহাই পাবার জন্য। মা, বোন-টুলু আপা, ভাই-ছোটন, ছোট ভাই- টুম্পা এবং আমাদের গাইড ও একমাত্র ভরসা ভাইজান। বৃষ্টিতে কাপড় চোপড় চপ চপে, ভীষণ ক্ষুধার্থ, পা পুরোটাই অবশ আর চলছেনা। ভাইজান হিসেব করে বললেন আমরা প্রায় ১২ মাইল হেঁটেছি এই এক দিনে। চন্দ্রপুর, বাড়াই, গোসাইস্থল হয়ে ভারতের বর্ডারের প্রায় সন্নিকটে আমরা। কিন্তু এখনো পথ যেন আর ফুরায় না। এর মাঝেও আমরা শুনতে পাচ্ছি কসবা, মন্দবাগ আর আখাউড়া থেকে ভেসে আসছে কামানের আর আর্টিলারির গুলির গগন বিদারী আওয়াজ। ভীত সন্ত্রস্থ পুরো পরিবার অথচ এত পথ হেঁটেছিযে শরীর আর সইসে না। কেউ ঘুমিয়েছিল কিনা বলতে পারবোনা তবে,আমি ভেজা কাপরের গাট্টি-তে হেলান দিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজেও জানিনা।

 

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ সেই ১১ই এপ্রিল। বি. বাড়িয়াতে বিমান হামলার পর আমরা বাড়ী-ঘর  সমস্ত কিছু ফেলে রেখে পরনের কাপড় নিয়েই বিভ্রান্তের মতো ভয়ে বিহ্বল হয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম নিরাপদ কোনো আশ্রয়ের উদ্দেশে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দু’বেলা পেট ভরে প্রশান্তিতে খেতে পারি নাই আমরা। পরিষ্কার টিনোপলিন দেওয়া ধোয়া সাদা বিছানার চাঁদর বিছানো বিছানায় আড়মোড়া ঘুম হবে না আর। সকালে সবাই একসাথে চা ও খাওয়া হয়নি আজ অব্দি। আলু ভাজি দিয়ে পরোটা খাওয়া হয়নি প্রাতঃরাশ। রেডিওতে প্রতি রোববারের মত দুপুরে ভাত খেয়ে শোনা হয়নি নাটক। শুনিনি সেই খোকা বাবুর প্রত্যাবর্তন নাটিকা বা কাবুলিওয়ালার গল্প। 

লণ্ডভণ্ড জীবন মৃত্যুর ভয়ে কম্পিত। নিদ্রাবিহীন রাত কাটানো। কোনভাবে ঘুমোলে স্বপ্নে শুনতে পেতাম বুট জুতোর আওয়াজ। মনে হতো এই বুঝি দরজাটা এক জোরছে লাথি মেরে ভেঙ্গে ফেললো। রাইফেল তাক করে ঘরে ঢুকে নির্বিচারে গুলি করে মেরে ফেলবে আমাদের সবাইকে। পলাতকদের অনেকেই আশ্রয় দিতে ভয় পায়। গ্রামের মানুষগুলোও আমাদের আশ্রয় দিতে শংকিত বোধ করছে। কারণ আমাদের বাবা মুক্তি বাহিনীতে যোগে দিয়েছে। যদি কেই বলে দেয় যে আমরা একটি মুক্তি বাহিনীর পরিবার এই গ্রামে আশ্রিত; এটি যদি পাকিস্তানী আর্মি জানতে পারে তাহলে যে কোন সময় হামলা করবে নিরীহ গ্রামের মানুষের উপর। নিশ্চিত প্রাণ হারাতে হবে তাদের। হঠাৎ ঘুম ভাঙলো মা এবং অন্যদের কথা শুনে। তাকিয়ে দেখি দেখি বৃষ্টি থেমে গেছে ফের সবাই রেডি পোটলা গাট্টি নিয়ে। রওনা দিতে হবে  পাঁচশ গজ দূরে। ধজনগর মসজিদের পরেই হল ভারতের ( ইন্ডিয়ার ) বর্ডার। এই ঐতিহাসিক লাইনটা পার হলেই আর আমাদের মারতে আসতে পারবে না পাঞ্জাবিরা। আর চোখ রাঙ্গিয়ে তাকাবে না আমাদের দিকে পাঞ্জাবীদের দোসররা। আমরা হবো মুক্ত বিহঙ্গ অতঃপর রিফিউজি।

একটি ইন্সুলার জীবনের যবনিকা আর এক নতুন জীবন নাটকের প্রথম অংকের শুরু প্রথম পর্বের।

 

 

স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং আমরা রিফিউজি ।। দুই ।।

 

হাটা শুরু হলো পাহাড়ের দিকে ধজনগর থেকে ইন্ডিয়া অভিমুখে।সবাই চুপ-চাপ হেঁটে চলছে বেশ উঁচু একটা পাহারে। ততক্ষণে পাহাড়ের চুরায় আমরা, ওখান থেকে দেখা যাচ্ছে একটা সমতল ভেলী তার পাশে ছোট্ট একটি নালা আর পাশেই পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ একটি পুকুর। পুকুরের ওপর পারে বেশ কয়েক শতাব্দী পুরোনো একটা জরাজীর্ন মসজিদ। এই মসজিদের পাশ থেকে প্রায় ২০০ গজ সমতল জায়গা আবার অন্য একটি পাহাড়ের পাদদেশে মিশে গেছে। পাহাড়ের পাদদেশ থেকেই ইন্ডিয়া শুরু।  

পথ-তো আর ফুরোই না, প্রায় গোধোলির সময় হয়েছে।  আমরা কেউ জানিনা আমরা কোথায় যাচ্ছি আমাদের ভাইজান ছাড়া। জানিনা কোথায় কাটাবো আজকের এই রাতটি।  

আমার বয়স ১২ বছর প্রায়। ছোটনের ৯ আর টুম্পার তখন ৫ বছর। এতটুকু বয়সে জীবন বাঁচাতে এতদুর হেঁটে আসতে হয়েছে। ক্লান্ত সবাই। ইচ্ছে অথবা অনিচ্ছায় হয়ত এইভাবে কেউ হাঁটবেনা। আমাদের জীবনেও এত পথ হাঁটিনি কোনোদিন। কাল বৈশাখীর ঝড় ও শিলা বৃষ্টির অদ্ভুদ আচরণ। জীবনেও ভাবিনি এমন পরিস্থিতিতে আমাদের পরতে হবে।

 

 

মসজিদ পার হলাম। মাগরিবের নামাজের জন্য মুসুল্লিরা তৈরী হচ্ছেন। মনে মনে ভাবলাম

পাকিস্তানিরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে যখন ভৈরব দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো ঠিক তখন তারাও বলছিলো ”ইয়া আলী, আল্লাহ হু আকবর”। আর আমরা যারা জীবন বাঁচার জন্য পালিয়ে যাচ্ছিলাম তখন আমরাও খুব জোরে গলার সব শক্তি দিয়ে সেই একই আল্লাহকে ডাকছিলাম আর দোয়া পড়ছিলাম “লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ্ জালিমীন” দুই পক্ষই একই সৃষ্টি কর্তার অনুসারী কিন্তু এক দল আরেক দলকে মারার জন্য মরিয়া। বিচিত্র এই মানব জাতি। কিন্তু কেন? আমরা মসজিদ অতিক্রম করললাম আর উপনীত হলাম ভারতের সীমান্তে। ভয়-ভীতিকে পরাজয় করে অপরিচিত একটি নতুন দেশে পদার্পন হলাম। অপেক্ষায় থাকতে হবে আগামী দিন আমাদের কি উপহার দিবে।

 

বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করে আমরা জানতে পারি যে- আমাদের পিতা ১/২ এপ্রিলে  ইন্ডিয়াতে প্রবেশ করেছে। যদিও তিনি শ্রীমঙ্গল ইন্ডিয়া সীমান্তের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা ইপিআর বিওপিতে রয়েছেন। বিপদের আশঙ্কা দেখলেই তারা প্রবেশ করবেন ভারতে। আমাদের পিতা- কৈলাস নামে একটি শহরে আমাদের আসতে বলেছেন। তিনি এ খবর পাঠিয়েছেন উনার কোম্পানির এক সিপাই সহকর্মীকে দিয়ে। উনার নাম মোস্তফা। এই মোস্তফা নামের লোকটি আমাদের খোঁজে- হেঁটে, নৌকায়, বাসে ও রিক্সা করে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে এসেছিলেন। সেখানে আমাদের না পেয়ে তিনি গিয়েছিলেন আমাদের সেই গ্রামের বাড়িতে। ওখানে জানতে পারেন আমরা আমাদের আরেক আত্মীয়ের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছি। বেচারা অনেক পথ পারি দিয়ে আমাদের পিছু নিলেন বাবার সংবাদটা দিতে। কিন্তু উনার সাথে আমাদের সাক্ষাত হয়নি তবে, বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা বাবার পাঠানো সেই সংবাদটি পেয়েছি। এরপর তিনি (মোস্তফা ভাই) চলে গেলেন নিজের বাড়ির উদ্দ্যেশে। জানতে পেরেছি মোস্তফা ভাইয়ের বাড়ী চৌদ্দগ্রামে। তিনি সেই যে গেলেন আর ফিরে আসেননি। ব্যক্তিটির নাম জানি কিন্তু পুরো ঠিকানা না জানার কারণে স্বাধীনতার পরেও উনাকে খোঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। তিনি আদৌ বেঁচে আছেন না পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন কোনটায় জানিনা আমরা। মোস্তফা ভাই যেখানেই থাকুক আল্লাহ তাকে শান্তিতে রাখুক এই দোয়া করছি। জানিনা অজানা আর কত জীবন যে এভাবে ঝরে গেছে।

হাটতে হাটতে ইতমধ্যে আমরা প্রবেশ করে গেছি ইন্ডিয়াতে। খাড়া পাহাড়ের পথ হেঁটেই চলেছি। এই পাহাড়ের বাগানটি কাঁঠাল বাগান তাই কাঁঠাল গাছে পরিপূর্ণ। পাহাড়ের প্রায় মাইল খানেক প্রশস্ত সমতল ধানের জমি আর জমিগুলোর ওপারে লোকালয়, ঘর- বাড়ি দেখতে পাচ্ছিলাম। আমরা পিচ্ছিল জমির আইলের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া কি যে কষ্টকর ছিল তা বর্ণনা করতেই কষ্ট হয়। জমিগুলোতে হাটু পানি পূর্ণ। পা পিছলে পড়ে প্রতি তিন চার কদমেই। হাটু পানি কর্দমাক্ত জমিতে পা ডুবে গেলে সেটি টেনে উঠিয়ে আনা বেশ কষ্ট কর। তারপরেও সে-সবকে জয় করে খুব ভয়ার্ত জাতীয় নামের একটি গ্রামে আমরা পৌঁছে যায়। গ্রামের নাম পাণ্ডপপুর।

 

 

স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং আমরা রিফিউজি ।। তিন ।।

 বিএসএফ আমাদের ঐ রাতে তাদের ক্যাম্পে খাওয়ালো। পিতার চাকরির বদৌলতে মনে হয় এই আতিথেয়তা পেলাম আমরা। পুরা পৃথিবীতেই মনে হয় এই পেশার লোকদের মধ্যে একটা চমৎকার সহানুভূতি কাজ করে। সেদিন মনে হলো শুধু এটা কাজ করে না ঐ পাপিষ্ঠ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীদের। ওদের নিকট সব বাঙালিই হিন্দু এবং সব বাঙালিই ওদের নিশানা – হত্যা করাই যেন ওদের একমাত্র পেশা। তাড়াতাড়ি করে ওই রাতেই বিএসএফ এর মহানুভব মানুষ গুলা আমাদেরকে ক্যাম্পের থেকে অর্ধ মাইল দূরে এক হিন্দু বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিলো। সারাজীবন আমি এবং পরিবারের সকল বিএসএফ এবং সেই হিন্দু পরিবারের নিকট ঋণী। তাদের এই মানবিকতার ঋণ আমরা জীবনেও পরিশোধ করতে পারবো না। 

 

যখন আমার পরিচিত অনেক উগ্র জাতীয়তাবাদী পন্থীরা বলেন যে ভারত তার স্বার্থের জন্য আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে উপকার করছে।  হতে পারে ভারত সরকার তার স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তাই করেছে। কিন্তু আমাদের কে যারা ঐ দিন থাকতে দিয়েছিলো ওরা সেদিন কি করেছিল? একান্তই মানবতার পুজা নয় কি? আমি হলফ করে বলতে পারি তাদের কোন খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। তাই আমি আজীবন ভারতের কাছে এবং ভারতের জনগণের কাছে ঋণী থাকব।

 

 

সে রাতের আবার পূনরাবৃত্তি করছি। ঐ রাতে বিএসএফ এবং আমরা যে বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সে বাড়ীর লোকজন নিজেদের ব্যবহৃত বিছানা বালিশ শুকনো কাপড়-চোপড় দিলো। সকালে চা- মুড়ি- চিড়া নাস্তা ও দিলো। আত্মীয়-স্বজনের মত আমার মা কে  নিয়ে রাখলেন তাদের অন্দর মহলে। বেশ বর্ধিষ্ণু পরিবার বলে মনে হলো তাদের আচার-আচরণে। বেশ অনেকটি ঘর রয়েছে তাদের। পুকুর পাড়ে বসার জায়গা রয়েছে। অনেক বড় একটা গরুর গোয়াল ঘর। বিশালাকৃতির তিন তিনটা খড়ের পালা। কোণ আইসক্রীমের মতো নীচে মোটা উপর দিকে সরু। সোনালী খড়ের এমন কারুকাজ দেখতে সবার ভালই লাগবে । পুকুরের পরেই বিশাল আনারস আর কাঁঠাল বাগান। বাড়ির অন্যপাশে প্রধান সড়কের পাশেই তাদের বিশাল মুদি খানা দোকান। হাড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে সব পাওয়া। দোকান  তিন চার জন মানুষ কাজ করতে দেখলাম।

 

অনুগ্রহে আর কত দিন থাকা যায় তাই বাবার অনুপস্থিতে মায়ের ঘর গোসানোর চেষ্টা শুরু করলেন। অনুগ্রহ করে বেঁচে থাকা অনেক অসস্মানজনক। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় মা তার সাধ্যমত কিছু টাকা পয়সা এবং স্বর্ণ অলংকার সাথে করে নিয়েছিলেন। মা সে স্বর্ণ-অলংকারের বিনিময়ে নিলেন ইন্ডিয়ান রুপি। সে টাকা দিয়ে বাসন-বাতি, মাদুর, লেপ-তোষক, বিছানার চাদর, চাল-ডাল কিনেছিলেন। জীবন যে কত প্রকট তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলঅম। বিশ ফুট লম্বা, দশ ফুট চওড়া ঘরের এক কোণায় আমরা থাকি। আর বাকি সবটাই থাকে খালি। ওঁদের বাড়ির বৈঠক ঘরটাতে চার পাঁচটা চেয়ার আর একটা মস্ত বড় কাঠের টেবিল এই হলো তাদের আসবাব পত্র। আমরা মাটিতে মাদুর বিছিয়ে তোশক পেতে ঘুমাতে হতো। উপরের ছাউনিতা ছিল ছনের  আর দেয়ালটা লাল মাটির। ২০ইঞ্চি দেয়াল ছোট্ট দুইটা জানালা আর চারটা দরজা আধো এল আর আধো আঁধারি ঘর; ভাগ্গিশ শেতসেতে ছিলোনা।

রান্নার চুলাটা থাকার ঘরের উঠানের একপাশে এক চালা একটা ছাপড়া ঘরে। রান্না শেষে খাবার গুলো থাকার ঘরে নিয়ে আসা হয় এবং এখানে খাওয়া হয়। সারা দিন আর কোনো কিছু করার নাই – জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই আর পাহাড়ের শেষ প্রান্তে এসে তাকিয়ে দূরে আমার সোনার বাংলাকে দেখি নয়ন ভরে আর ভাবতাম ইস কবে যে যাবো ফিরে নিজ গৃহে।

 

 

 

স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং আমরা রিফিউজি ।। ৪ ।।

 

এক থেকে দেড় মাইল ঐ জমিনের আইলের উপর দিয়ে হেটে হেটে শেষ পর্যন্ত প্রবেশ করলাম গ্রামের ভিতর – জরাজীর্ণ ওয়ান গুলো ছনের ঘর – গরুর গোয়াল – ফসল মাড়ানোর গোলাকৃতি উঠান পেরিয়ে দেখতে পেলাম একটা পায়ে চলা মেঠো পথ – ততক্ষনে গোধলী প্রায় সন্ধ্যায় নিমজ্জিত হতে চলেছে। একজন আরেকজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি এখন কি করবো ? মুখে কথা বলার শক্তি প্রায় নাই বললেই চলে – ক্ষুদার্থ – গলা শুস্ক – বৃষ্টি ভেজা সিক্ত পোশাক আর ঝোড়ো হাওয়ায় ঠান্ডা – সবাই আমরা হাইপো থার্মিয়ায় আক্রান্ত। আহা রে আজ ও মনে পরে আমাদের সবচে ছোট ভাই টুম্পা – পারছে না আর এক কদম ও হাটতে শীতে আর ঠান্ডায় ওর মুখ অনবরত কাঁপছে আর কাঁদছে – দাঁতে দাঁতে বারী খেয়ে খট খট আওয়াজ করছিলো। ওর দিকে তাকানো যাচ্ছিলো নো। নাদুস নুদুস ( আদর করে সবাই ওকে ভোটলা বলে ডাকতাম) টুম্পা ৩ সপ্তাহে শুকিয়ে মাংস আর হাড্ডি গুনা যাওয়ার মতো ওর অবস্থা। আমার বোন ওকে ধরে ধরে পথ চলতে সাহায্য করছিলো আর শান্তনা দিচ্ছিলো – কিন্তু ঐ আশাবিহীন সময়ে কি কোনো প্রকার আশা কি কাউকে দেয়া যায় কিনা তা আমার জানা ছিল না।

নেই কোন পথিক, নেই কোনো ঘর বা বাড়ি, রাস্তাটা টিলা কেটে বানানো, লাল মাটি – অনেকটা দেখতে আমাদের গ্রাম গোপীনাথপুরের কবরস্থান টিলার মতো। পুকুর পারের ওপর প্রান্তে কবরস্তান। ছোট বেলায় ঈদে পার্বনে গ্রামে গেলে এই রকম লাল মাটির পথ ধরে কিছু দুর হাঁটলেই হাতের বাঁ- দিকে আমার দাদার কবর। সুযোগ ডেলে কবর জিয়ারত করতে যেতাম। হাটতে হাটতে মনে পড়লো অনেক কথা। দাদির মাথায় জোট বাধা চুল। হয়তো ক্লান্তিতে হিলুসিনেশন হচ্ছিলো কি না জানিনা। হঠাৎ পাশ দিয়ে হেটে গেলো কাঁধে ভার নিয়ে ত্রিপুরা জাতীয় তিন চার জন লোক। ভাইজান ওদের সাথে একটা বিশাল হাসি দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু তারা টু শব্দটিও না করে আমাদের পাস কাটিয়ে উল্টোপথে চলে গেলো দ্বিধাহীন ভাবে। খালি পায়ে পিচ্ছিল পথ আর মাঝে মাঝে ছোট ছোট পাথরের টুকরায় পাড়া দেওয়া যে কি কষ্ট তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছিলাম। আম্মা একটা কথাও বলছে না। রাস্তাটা সম্পূর্ণ কাদা ই কাদা শুধু একটা লিক ( চুয়াডাঙ্গায়- উত্তর বঙ্গে) লিকপড়েছে মানে হচ্ছে যে গরুর গাড়ির চাকার পেষণে কাদা শক্ত হয়ে উঠেছে। পথ শুষ্ক ১২ থেকে ১৮ ইঞ্চি চওড়া মাত্র। কতক্ষন পর আবার একটা টিলা। উঁচুতে উঠা যে কষ্টের তা সেই জানে যে সারাদিন কিছুই খাইনি। একেক-টা কদম মনে হচ্ছিলো ধরণী তুমি দ্বিধা হও আর আমি প্রবেশ করি ; যাতে না বের হতে হয় চিরতরে। এই জনপদে মনে হলো আমরাই প্রথম উনুপ্রেবেশ কারী শরণার্থী – এর আগে কোনো দল এখানে আসছে বলে মনে হল না। যে দুই সপ্তাহ আত্মীয়দের আশ্রয়ে ছিলাম তখন নিজেদের এতটা অসহায় মনে হয় নাই। জীবনে এই প্রথম আমরা কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলাম। তবে বেশ ক’টা দিন ফুর্তিতে কাটিয়েছিলাম প্রথম প্রথম। কিন্তু গ্রামের মানুষেরা আমাদেরকে থাকতে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার মানুষেরা সবচেয়ে বেশি দেখেছে এবং ওখানকার বাসিন্দারা খুবই বিপদে ছিল নয় টি মাস।  আমাদেরকে লুকানো ওদের জন্য বিপদজনক। তাই উপায়ান্তর না পেয়েই আমাদেরকে পালিয়ে যেতে হলো ভারত অভিমুখে – এক অজ্ঞাত যাত্রায় – আমরা কেউই জানিনা ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কি রেখেছে। ৪৪ বছর আজ ঐ নিরুদেশ যাত্রার কথা চিন্তা করতেই গায়ের লোম শিউরে উঠে। জীবন যে কারো জন্য এত কঠিন আর পথ চলা যে এত বন্ধুর হতে পারে তা সেই বলতে পারবে যে এই রকম একটা বিপদজনক অবস্থায় পড়েছে।

‘এ’ তুফান ভারী দিতে হবে পারি – কান্ডারি হুশিয়ার ”

উঁচু টিলায় উঠেই দেখা পেলাম হাতের বামে একটা বড় ফুটবল খেলার মাঠ আর তারই কোনায় উঁচু মাটির পাঁচিল ঘেরা বিএসএফ এর চৌকী। আমরা মাঠের মাঝ বরাবর দিয়ে হেটে হাজির হলাম  বিএসএফ সেন্ট্রির সম্মুখে। হল্ট হ্যান্ডস আপ- রাইফেল তাক করে ধরে ব্যাংকার থেকে উঁকি মেরে স্থির দারিয়ে বিএসএফ জোয়ান। শুধু ওঁর বেল্ট থেকে মাথা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। আম্মা বললো দাঁড়িয়ে পর সবাই আস্তে আস্তে বললেন ওর গোঁফ এর পাঁকানো দেখে মনে হচ্ছে এই বেটা JHAT সম্প্রদায় ভুক্ত হবে। ভাইজান আর আম্মা এগিয়ে কথা বললেন সেন্ট্রির সাথে।  অবাক হয়ে দেখলাম আম্মা অনর্গল নির্দ্বিধায় হিন্দিতে কথোপকথন করছে। টুলু আপা এর মধ্যেই নীচু স্বরে বললো – মা যখন কাস্টমসে  চাকরি করতেন তখন হর হামেশা ইন্ডিয়ান কাস্টমস অফিসারদের সাথে বেনাপোল, গোদাগাড়ী, প্রেমতলী, আখাউড়া, তামাবিল চেক পোস্টে হিন্দিতে কথা বলতেন তাই তিনি হিন্দিতে পারদর্শি। সবাই ভুলেই গিয়েছিলাম যে আম্মার জন্ম কলকাতায়, ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আসা। কত হাজার বার যে আমাদের সাথে আর আব্বার সাথে গল্প করতো সেই ট্রামে চড়া এসপ্ল্যানেড – পার্ক সার্কাস- হাওড়া ব্রিজ- গড়ের মাঠ আর সেন্ট পৌলস বা ফোর্ট উইলিয়াম এর স্মৃতি।

পা আর চলছিলনা না দাঁড়িয়ে থাকাও যে কত কষ্টের চিল তা বোঝানো যাবেনা। ভেজা ঘাসেই বসে পড়লাম মনের অজান্তে। একটু ভয়ার্তও ছিলাম- কি যে বিশাল দস্যু ধরণের মোছ ওই প্রহরীর। দেখলে কার না ভয় লাগবে বলেন ?

‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো ; ক্ষমা করো ; প্রভু। ….পথে যদি পিছিয়ে – পিছিয়ে পড়ি কভু – ক্ষমা করো ; প্রভু। বসা থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙতে যেয়ে পশ্চিম দিকে তাকাতেই দেখলাম ওই বহুদূরে ফেলে আসা দেশের বিশাল জলাশয় গোপীনাথপুর। বাড়াই গ্রাম বিস্তৃত সরিষা ডুলির বিল এ আস্তে করে অস্ত গেলো। লাল রাতুল আলো বিকিরণ করে জলের উপরে – মনে মনে ভাবলাম –আবার কি আসিব ফিরে এই বাংলার – খাল – বিল বা নদীটির তীরে ?

 

আমার স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৯৭১ পর্ব ।। ৫ ।।

তখনও শরণার্থী শিবির খোলা হয় নাই আমার ওই হিন্দু পরিবারের বাড়িতেই থাকছি – কঠিন সে জীবন – স্কুল নেই – নেই কোন লেখাপড়া – সারা দিন ঘরেই বসে বসে দিন কাটাচ্ছিলাম কয়েক টা দিন। অভাব যখন আসে আর যদি উপাৰ্জন যদি না থাকে সব কিছু যখন কিনে খেতে হয় তখন অল্প দিনেই টাকা ফুরিয়ে যায়।

আমাদের ও একই অবস্থা প্রায় – মা বললেন , এই ত্রিপুরাদের কাছ থেকে লাকড়ি কিনা আর সম্ভব না। আমাকে বললেন কাল থেকে তুমি জঙ্গলে যেয়ে কাঠ, দল পালা, আর শুঁকনো গাছের পাতা কুঁড়িয়ে নিয়ে আসবি তা না হলে লাকড়ি কিনতে কিনতে সব পয়সা ফুরিয়ে যাবে। যেই বলা সেই কাজ পর দিন সকালে ওই বাড়ি ওয়ালার কাছ থেকে একটা দা’ ধার করলাম আর বেরিয়ে পড়লাম কাঠ জোগাড়ে। সারাদিন বৃষ্টি, গাছপালা-জঙ্গল সবই ভেজা। লাল মাটির টিলা গুলো পিচ্ছিল। হাতের পাশে যা পেলাম ওই গুলোই এক জায়গায় করে টেনে টেনে নিয়ে আসতে শুরু করলাম – একেবারে চপ চপে ভিজা। কাঁঠাল গাছের ডাল পালা , শুকিয়ে ভেঙে পড়া ডাল পালা, মরিচ্যা গাছ নামের এক ধরনের ভেজিটেশন জাতীয় লম্বা লম্বা গাছ কেটে ও গুলো শুকিয়েই করতে হবে রান্না। এগুলোর আবার অভাব নেই। লক্ষ্য লক্ষ্য গাছ পাহাড়ের ভিতর। বড় বড় বিশাল গাছ গুলোতে দেখতে পাচ্ছি অনেক শুকনো ডাল পালা। কিন্তু গাছ তো বেয়ে উঠতে পারি না। আমার জীবনেও গাছে উঠা শিখে উঠতে পারিনি। তীক্ষ্ণ গাছের পাতার ধাঁরে হাত পা’ কেটে যাচ্ছিলো। রক্ত বেরোচ্ছে দেধারে, লজ্জাবতী গাছ গুলো আমার দুর্দশা দেখে কেমন যেন লজ্জা পেয়ে লুকিয়ে যেতো। মনে হতো

আমার কাছে; মুখ, হাত, পা কোনো কিছুই রেহাই পাচ্ছিলো না ওই গাছের তীক্ষ্ণ ধার পাতার ছোবল থেকে। জঙ্গলের ভিতর ভীষণ গরম এই ভাবেই শুরু হলো আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়।

জোঁক, মাকড়সার জাল, চেলা আর মাঝে মধ্যে ধোরা সাপ আড়মোড়া ভেঙে পালিয়ে যেত আমার পদার্পণে। একা এক দিন ভর লাকড়ি কুঁড়াতে শুরু করলাম। আমার নতুন এল ব্যস্ততা – ক্ষিদে পেলেই নাগালের মাঝে পাওয়া ছোট কাঁঠাল গাছ থেকে পেরে খেয়ে নিতাম একটা কাঁঠাল অথবা পাহাড়ের ঢালুতে আনারস বাগানে যেয়ে লাল দেখে একটা আনারস ওই দা দিয়ে কোনো রকমে কেটে আনারসের চোখ গুলো এড়িয়ে গো গ্রাসে সাবাড় করে দিতাম একটা আস্ত আনারস। জীবনেও কোনো দিন দুই থেকে তিন ফালির উপর খাই নাই। কান্না পেতো – এত কষ্ট ; জীবনেও এত কাজ কর্ম করি নাই কোনো দিন। চোক্তা পাতার ঘষায় সর্ব শরীর প্রচন্ড ভাবে চুলকাতো, কিন্তু- চুলকিয়ে সময় নষ্ট করার মত প্রাচুর্য ছিল না আমার তখন। সারাদিন পর বিকালে ঘরে ফিরে আসতাম। এই হলো আমার নিত্য দিনের কাজ। ভাইজান আর আম্মা চলে গেলেন গোকুল নগর হয়ে শেখের হাত হয়ে আগরতলা। প্রধান রাস্তা ওই খান থেকেই শুরু। আমাদের আশ্রয় দাতা বাড়ি ওয়ালা সব বাতলিয়ে দিলো।; আগরতলা তে যেয়ে খোঁজ পেলো আমার বাবার কাজিন মমতাজ বেগমকে। আমাদের খুবই প্রিয় আমেনা ফুফুর খবর। আগরতলায় তখন অনেক বাঙালিদের সমাগম। চিটাগংয়ের আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী ওখানে সব দেখাশুনা করছেন। উনিই বলে দিলেন ফুপাকে কোথায় পাওয়া যাবে। আমেনা ফুফু কলেজ জীবন থেকেই ছাত্র লীগ করতেন। ওনার বাবা আমাদের গনি দাদা ফুফুকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। ফুফু আম্মাকে অনুরোধ করেছিলেনা ওনার বাবাকে বোঝানোর জন্য। শেষমেষ গনি দাদা আম্মার কথা মানলেন এবং ফুফুকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে দিলেন। সেই থেকে ফুপু আর আম্মার মাঝে গড়ে উঠেছিল এক সুদৃঢ় বন্ধুত্ব। ওই মহা বিপদের সময় আম্মা শরণাপন্ন হবেন ওনার কাছে সিদ্ধান্ত নিয়েই ছয় মাইল কাঁদা , পানি, পিচ্ছিল পথ পায়ে হেঁটে ভাইজান কে নিয়ে  প্রায় রাত আটটা নয়টার দিকে ফেরত আসলেন। আগরতলায় ভালো দামে আরো এক দফা গয়না বিক্রি করে কিছু পয়সা নিয়ে ফিরেলন সেই রাতে। পরদিন আবার যাবেন সেই ছয় ছয় বারো মাইল হাঁটা এবং বিশালগড়ে যাবেন আমেনা ফুফুর সাথে দেখা করতে। ফুপু ছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যা এবং বড় মাপের নেত্রী।

খুবই একজন স্নেহপরায়ণ আমেনা ফুপুর দেখা পাওয়ার অধীর অপেক্ষাই রাতে আমরা কেউই ঘুমাতে পারলাম না। এই মহাসমুদ্রের মাঝে উনিই আমাদের একমাত্র ভরসা। বিপদগ্রস্থ হয়ে মা প্রায় হিমশিম খাচ্ছিলো তখন ফুপুর ঠিকানা টা মা যেয়ে যান।’ মনে মনে খুবই আনন্দিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি, ওনার কথা বার্তায় বুঝতেই পারছিলাম আমরা। আমার পিতা ছিলেন আমাদের বংশের সবচেয়ে বড় এবং সবার প্রিয় ‘‘খোকা ভাই”। ফুপু কে আমার আব্বা খুবই স্নেহ করতেন – কারণ আমার বাবার কোন বোন ছিল না তাই উনি সব কাজিনদেরকে খুবই আদর এবং স্নেহ করতেন। মা বললেন আমেনা আমাদের এই সময়ে ওর প্রিয় খোকা ভাইয়ের পরিবারকে ফেলে দিবে না। সবাই ঘুমাও কাল ওর সাথে যেয়ে দেখা করে সব ঠিকঠাক করে ফেলবো। সকালে মান্দারপুর থেকে এসে হাজির হলেন আমাদের দাদা অসতিপর সায়ীদ মিয়া চৌধুরী। তিনি আমাদের অনেক কষ্ঠে খুঁজে পেলেন। নেও এই দু’ হাজার টাকা আমি মফিজ মাস্টারের কাছে পাঁচ কানি জমি ডাইসুদি ( আজও জানিনা এই শব্দটার অর্থটা কি – কিন্তু ঐ যে শুনে ছিলাম তা আজ মনে আছে) দিয়ে এই টাকাটা তোমাদের জন্য নিয়ে এসেছি। আমার ভাতিজা খোকা মিয়া সারা জীবন সেই কলকাতার দিন গুলো থেকেই আমাকের এত দেখাশুনা করেছে। ওর ঋণ কি আর শোধ করা যাবে এই অল্প কয়টা পয়সা দিয়ে। দাদা সেই দিনই আবার ফিরে গেলেন। আমাদের ঐ অবস্থা দেখে বেচারা চোঁখের পানি সারাক্ষন থামাতে পারেন নি। কান্না বিজড়িত ভাবে বিদায় নিলেন তিনি াামাদের থেকে। ওনার ওই ঋণ আমরা জীবনেও শোধ করতে পারবো না। ভাইজান আর আমি দু জন অনেক ধজ্যনগর মসজিদ পার হয়ে অনেক দূর পর্যন্ত হেটে হেটে এগিয়ে দিয়ে আসলাম দাদাকে। উনি ঐ রাতে থাকবেন বাড়াই গ্রামে এক আত্মীয়র বাড়িতে তার পরের দিন সকালে আবার রওনা দিয়ে হেটে হেটে যাবেন মান্দারপুর গ্রামে। উনাকে পার হতে হবে সেই সিএনবি রোড। সাক্ষাৎ যমের মুখোমুখি হয়ে। অশ্রুসজল চোখে দাদা কে বিদায় দিয়ে আমরা দুই ভাই ফিরে আসলাম আমাদের আবাসস্থলে। মাথার উপর সূর্য টাকে ফেলে পিছনে আমার অবারিত বাংলার আলিঙ্গন উপেক্ষা করে।

চলবে ..

লেখকঃ গবেষক, সাংবাদিক ও কম্যুইনিটি ব্যক্তিত্ব