o নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি সিইসির নির্দেশ o রাজশাহীতে প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ, প্রচার-প্রচারণা শুরু o প্রশাসন ও আইসিটির প্রশিক্ষণে থাইল্যান্ড যাচ্ছেন কুতুবদিয়ার প্রধান শিক্ষক জহির o নড়াইলের দুটি আসনে ১২ প্রার্থীর প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন o শাহজাদপুরে বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পালিত

আজ সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ |

আপনি আছেন : প্রচ্ছদ  >  মতামত  >  ইসলামিক স্টেট শেষ হওয়ার পথে, তারপর ?

ইসলামিক স্টেট শেষ হওয়ার পথে, তারপর ?

পাবলিশড : ২০১৭-০৭-২২ ১৯:৪৫:১৪ পিএম আপডেট : ২০১৭-০৭-২২ ২০:০৮:১৯ পিএম

।। মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার, পিএসসি, জি (অবঃ) ।।

এন্টিনে লাভসিয়ের নামক একজন ফরাসী বৈজ্ঞানিক ১৭৮৫ সালে বলেছিলেন “পদার্থকে কখনও ধ্বংশ করা যায় না”। বর্তমানে সন্ত্রাসবাদ কিংবা সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রেও পদার্থ বিজ্ঞানের এই ধারনাটি প্রচলিত হয়ে গেছে। সন্ত্রাসীদের প্রবনতা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়েছে যে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ শেষ হয়ে গেলেও আর একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ তার স্থান দখল করে নেয়। আর সে জন্যই সর্বশেষ সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস নির্মূলের পর তাদের স্থান কে দখল করতে যাচ্ছে,  কিংবা  আদতে তাদের সমূলে নির্মূল করা যাবে কি না অথবা আইএস নির্মূল হয়ে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যে কিংবা গোটা দুনিয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শেষ হয়ে যাবে কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে এসেছে। বিশেযজ্ঞরা আইএস নির্মূলের পর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থাকবে কিনা, সে প্রশ্নের উত্তর সরাসরি ‘না বলে দিয়েছেন। তা হলে কি অপেক্ষা করছে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ?

সমসাময়িক দুনিয়াতে  বিশেজ্ঞরা সর্বমোট ১৫টি শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের কথা বলেছেন। একটু পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে একটি শেষ না হতেই আর একটি জন্ম হয়েছে, কিংবা অনেকটা চেইন রিঅ্যাকশনের মত অন্যান্য সন্ত্রাসী দলের জন্ম হয়েছে। এই শীর্ষ ১৫টি সন্ত্রাসী গ্রুপ হল (১) আইএস, (২) আল-কায়দা, (৩) তালিবান, (৪) বোকো হারাম (আইএস এর অনুগত), (৫) লস্কর ই-তৈয়াবা, (৬) তেহরিক ই-তালিবান, (৭) হেজবুল্লাহ, (৮) আল- শাবাব, (৯) হামাস, (১০) এফএআরসি (কলোম্বিয়া), (১১) পি কে কে, (১২) আল-নুসরাত ফ্রন্ট (আল-কায়েদা অনুগত), (১৩) নক্সাল পন্থি (ভারত), (১৪) আইআরএ এবং (১৫) এলআরএ (দক্ষিন সুদান)। এতসব সন্ত্রাসী গ্রপের মধ্যে বর্তমানে আইএস এক নম্বর স্থান দখল করে আছে। আমরা দেখেছি এসমস্ত সন্ত্রাসী গ্রুপের উত্থানের পিছনে কোন না কোন শক্তি কাজ করেছে। আল-কায়দা বা তালিবানদের উথানে যুক্তরাষ্ট্র যেমন সহায়তা করেছে, তেমনি আইএস এর উত্থানের পিছনেও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রভাবশালী দেশ রয়েছে। তারাই এদের সৃষ্টি করেছে, আবার তারাই কোয়ালিশন ফোর্স বানিয়ে এসব সন্ত্রাসী বাহিনীর বিপক্ষে যুদ্ধ করছে।

ইতিমধ্যে ইরাকের মসুল ও সিরিয়ার আর-রাকা শহরে আইএস অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। ইরাকের মসুল শহরের অভ্যন্তরে আল নুরি নামে একটি বিখ্যাত মসজিদ রয়েছে। সেলজুগ সা¤্রাজ্যের স¤্রাট নুর-উদ্দিন ১১৭৩ সালে এ মসজিদটি নির্মান করেছিলেন ২০১৪ সালে এ মসজিদের পাদদেশে দাড়িয়েই আইএস নেতা আবু-বকর আলবাগদাদি আইএস এর আতœপ্রকাশের ঘোষনা দিয়েছিলেন। অথচ গত ২১ জুন ২০১৭ তারিখে পরাজয়ের দ¦ারপ্রান্তে এসে আইএস জঙ্গিরা ঐতিহাসিক এই আল-নুরি মসজিদটি বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়।

বর্তমানে ইরাকি সৈন্যরা আল-নুরি মসজিদের অতি নিকটে পৌছে গিয়েছে। আল-বাগদাদিকেও মসুলে আর দেখা যাচ্ছে না। এখন শুধু বাকি আছে আইএস এর রাজধানী খ্যাত সিরিয়ার আর-রাকা শহর। তাও আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কোয়ালিশন বাহিনীর দখলে আসবে বলে আশা করা যায়। এখন পর্যন্ত আইএস তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা হারিয়ে ফেলেছে। এমন একটি সময়ে সবার মুখে মুখে একটি কথা, “কি হবে আইএস এর পতনের পর ?”

প্রথমেই ধাক্কা লেগেছে আইএস এর আয়ের উৎসতে। আইএস ইরাক ও সিরিয়ার তাদের দখলকৃত এলাকায় একটি রাষ্ট্রের মত তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেছিল এবং কর আদায়, তেল বিক্রি, সুদ, জরিমানা কিংবা ডাকাতি করে টাকা আয় করত। এখন তাঁদের আয় ২০১৪ সালে যেখানে ছিল ১.৯ বিলিয়ন ডলাার, তা ২০১৬ তে নেমে এসে দাড়িয়েছে ৯০০ মিলিয়ন ডলার।

দ্বিতীয়তঃ আদর্শগত ভাবেও তারা পরাজিত হয়েছে। ইরাক ও সিরিয়াতে তাদের ভূমি বেদখল হওয়াতে তথাকথিত ইসলামিক খেলাফত আজ হুমকির মুখে। আদতে মুসলিম বিশ্ব এই তথাকথিত খেলাফতকে অগ্রাহ্য করেছে। কিন্তু একটি বিষয় কোনভাবেই অগ্রাহ্য করা যাবে না, তা হল ইসলামিক খেলাফতের এ আন্দলনকে একেবারে শেষ করা যাবে না। বিশেষ করে সিরিয়ায় শিয়া ও সুন্নি দুটি বিদ্যমান গ্রুপ কাজ করছে। একটি বাসার-আল-আসাদ সমর্থন করছে, অন্যটিকে সমর্থন করছে খোদ সৌদি আরব, তুরস্ক, জর্ডান এবং যুক্তরাষ্ট্র। এ সমস্ত অঞ্চলে সুন্নি আইএস না থাকলেও শিয়া-সুন্নি যুদ্ধ কখনও বন্ধ হবে না। ফলে আইএস শেষ হলেও আমরা তার পরিবর্তীত রূপ এতদঞ্চলে দেখতে পাব। এটাই অদৃস্টের পরিহাস।

তৃতীয়তঃ খোদ ইরাকেই আছে শিয়া-সুন্নির দ্বন্ধ। এই সাম্প্রদায়িক দ্বন্ধ সরকারের সকল অরগানে বিদ্যমান। ফলে আইএস যে কোন সময় এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, এটাই অবশ্যম্ভাবী।

চতুর্থতঃ ২০০৩ সালে সাদ্দাম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের শেষ কি হবে এটাই বড় কথা। আজ ১৪ বছর পর সবার মনে একই প্রশ্ন অনুকম্পিত হচ্ছে “এখন কি হবে ”। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরাকি সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত মতানৈক্যের কারনে আমেরিকান সৈন্য ইরাক থেকে উথড্র করে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই ওবামা সরকারই ইরাকী বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য ৩১০০ সৈন্য ইরাকে মোতায়েন করেছিলেন। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আইএস পরাজিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা সহসাই ইরাক ছাড়ছে না।

পঞ্চমতঃ  একটি শান্তিরক্ষী বাহিনী অথবা মনিটরিং ফোর্স ইরাক ও সিরিযা অঞ্চলে মোতায়েন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রস্তুত হচ্ছে। আর এই শান্তিরক্ষী বাহিনী থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ।

ষষ্ঠতঃ ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের ইরাক ছেড়ে যাবার ফলে এতদঞ্চলে একটি ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে এতদঞ্চলে সংগত করবেই ইরান একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী বাহিনীতে পরিনত হয়েছিল। শিয়া মতাদর্শের এ বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধির সাথে সাথে সুন্নিরা জোটবদ্ধ হতে শুরু করে। অনেকে মনে করেন এর ফলেই সুন্নি মতাবলম্বী আইএস এর উত্থান হয়েছে। সুতরাং সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা এ অঞ্চল ত্যাগ করবে না।

সপ্তমতঃ আমেরিকান সৈন্যরা এই অঞ্চল ছেড়ে দিলেই কুর্দিবাহিনী তাদের স্বাধীনতার আন্দলনে ঝাপিয়ে পড়বে, আর সুন্নিরা অন্য আর একটি জিহাদি গ্রুপ সৃষ্টি করে শিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। এ যেন নতুন বোতলে পুরাতন সুরা। তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক ও ইরান সম্বলিত এতদঞ্চলে কয়েকটি বিদ্যমান দল সক্রিয় আছে। এগুলো হল, পি কে কে গ্যারিলা, যা তুরস্ক থেকে স্বধীনতা চায়, কুর্দিস্থান, যারা স্বায়ত্বশাসিত হলেও, তারাও স্বাধীন রাষ্ট্র চায়, সিরিয়ার বাসার-আল-আসাদের শিয়া সমর্থনপুষ্ট বাহিনী বনাম সুন্নি বাহিনী, ইরাকের অভ্যন্তরে শিয়া-সুন্নি দ্বন্ধ ইত্যাদি অনেক বিবদমান দল। আইএস এর বিরুদ্ধে এক হয়ে যুদ্ধ করলেও, এই যুদ্ধের পর তারা আবার পুরানো দ্বন্ধ নতুন করে শুরু করবে।

অষ্টমতঃ উক্ত সময়ের ভিতরে আইএস একটি আর্ন্তজাতিক জিহাদি মুভম্যান্টে পরিনত হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৫০ দেশে আইএস এর সমর্থক সংগঠন রয়েছে। ২০১৭ পর্যন্ত আইএস তাদের সহযোগি সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ২৯ টি দেশে ১৪৩ টি আক্রমন রচনা করে, আর এতে ২০৪৩ জন মৃত্যুবরন করে। স্বভাবতঃই প্রশ্ন জাগে আইএস কি একেবারে নির্মূল করা যাবে ? উদাহরনস্বরূপ ফিলিপাইনের আবু সায়াফ, নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, সোমালিয়ার আল-শাবাব ইত্যাদি আইএস এর অন্যতম সহযোগী সংগঠন। আইএস বর্তমানে লিবিয়া, সিনাই, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এমন কি খোদ আমেরিকাতেও তাদের সহযোগী সংগঠন সৃষ্টি করেছে।

নবমতঃ আইএস এর প্রোপাগান্ডা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা সহজেই বিভিন্ন দেশের নিরীহ লোকদের বিশেষ করে উঠতি বয়সের তরুনদের তাদের দলে ভিড়াতে সক্ষম হয়েছে। তাদের মিডিয়াও অনেক শক্ত। আইএস নির্মূল হলেও এতসব কর্মকান্ড সহসাই বন্ধ হবার নয়।

আইএস এর আপাত পতন সংগঠনের উপর কিছু প্রভাব ফেলতে পারে। সেগুলো হল (১) সন্ত্রাসী আক্রমন কমে যাওয়া (২) তাদের উপর সহযোগী সংগঠন গুলো আস্থার অভাব, কিংবা জিহাদিদের দলে ভিড়ানোর প্রক্রিয়া বন্ধ কিংবা মন্থর হয়ে যাওয়া। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব কখনও একেবারে নির্মূল করা যাবে না। বর্তমানে আইএস এর সংঘবদ্ধ তৎপরতায় কিছুটা ভাটা পড়লেও, এ সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক কিংবা সৌদি আরবে বিক্ষিপ্ত হামলা বেড়ে যেতে পারে। এমনকি পুরো দুনিয়াতে আইএস তাদের আক্রমন তীব্র করতে পারে। অনেকের মতে আইএস এর  আপাত পতনে তাদের প্রথম অধ্যায় শেষ হলেও, দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হবে ।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে টালমাটাল অবস্থা বিরাজমান। সৌদি-ইয়েমেন দ্বন্ধ, সৌদি-কাতার দ্বন্ধ, সৌদি-ইরান দ্বন্ধ, শিয়া-সুন্নি দ্বন্ধ, কুর্দি-তুরস্ক দ্বন্ধ ইত্যাদি উদ্বায়ী অবস্থার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ন্যাটোর অংশগ্রহনে এক উত্তাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। মুসলিম উম্মা আজ একটি অস্তিত্বের সংকটে বিরাজমান করছে। এমন একটি তরল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মাঝে আইএস এর মত অন্য আর একটি সংগঠনের জন্ম অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করে আর্ন্তজাতিক বিশ্লেষেকেরা ।

লেখকঃ বর্তমানে এআইবিএ, সিলেট চাকুরীরত।