o অভিনব কায়দায় গ্যাস সিলিন্ডারে ফেন্সিডিল পাচার; গ্রেফতার ১ o মাটিরাঙ্গাতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত o নাচোলে কারেন্ট পোকা দমনে সচেতনা মুলক সভা অনুষ্ঠিত o শিবগঞ্জে আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মলীগের ১১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত o কানসাটের ২ প্রতিষ্ঠানে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়

আজ মঙ্গলবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ |

আপনি আছেন : প্রচ্ছদ  >  মতামত  >  পবিত্র কুর-আনের সূরা আর-রুম ও সৌদি - ইরান মতবিরোধ

পবিত্র কুর-আনের সূরা আর-রুম ও সৌদি - ইরান মতবিরোধ

পাবলিশড : ২০১৭-০৬-১৪ ১৪:৫৯:০৪ পিএম আপডেট : ২০১৭-০৬-১৪ ১৫:২৬:৫১ পিএম

।। মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার, পিএসসি, জি (অবঃ) ।।

পবিত্র কুরআনের ৩০ নং সূরা আর-রুমের প্রথম ৫টি আয়াতের বাংলা অর্থ এ রকম; (১) আলিফ লাম মীম (২) রোমকগন পরাজিত হয়েছে (৩) (আরবের) নিকটবর্তী অঞ্চলে। কিন্তু ওরা ওদের এ পরাজয়ের পর শীঘ্রই বিজয় লাভ করবে (৪) কয়েক বছরের মধ্যেই, আগের ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। সেদিন বিশ্বাসীরা আনন্দিত হবে, (৫) আল্লাহর সাহায্যে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন এবং তিনিই পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।

ইসলাম ধর্মের নবী হযরত মুহাম্মদ (স:) ৫৭০ খৃষ্ঠাব্দের ২৯ আগষ্ট বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে জন্ম গ্রহন করেন। তারপর ৬১০ খৃষ্টাব্দের ১০ আগষ্ট তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন। তখন তাঁরবয়স ছিল ৩৯ বছর, ৩ মাস ২২ দিন। ৬১০ খৃষ্টাব্দের নবুয়ত প্রাপ্তির এই সময়ে ০৫ টি ভিন্ন ধর্মীয় সত্ত্বার আবির্ভাব হয়। এ গুলো হলো (১) মক্কার একশ্বরবাদী মুসলমান, যাকে বলা হয় মনোথেইজম (২) মূর্তিপুজক ও বহু-ঈশ্বরবাদী মুশরিকগন, যাকে বলা হয় পলিথেইজম (৩) ইরান তথা পারস্যের অধিনস্ত সাসানীয় সাম্রাজ্য, যারা ছিলেন তাদের নবী জরথুষ্ট্রের কর্তৃক প্রচারতি ধর্ম জরইস্ত্রিয়ানিজম এর অনুসারী। তাঁরাও একেশ্বরবাদী, কিন্তু সাথে সাথে তাঁরা ছিলেন  অগ্নি-উপাসক। (৪) রোমান বাইজেন্টাইন সম্্রাজ্য, যারা ইনজিল কিতাবধারী খৃষ্টান, হযরত ঈসা (আ:) এর অনুসারী। তাঁরাও ছিলেন একেশ্বরবাদী এবং মূর্তি ও অগ্নিপুজার বিরোধী। (৫) পঞ্চম নম্বারে ছিল ইহুদিরা যাদের বাস ছিল বর্তমান ইসরাইলে, তারা জুদাইজমে বিশ্বাসী ছিল। তারাও ছিল একেশ্বরবাদী ও কিতাবী।

পার্সিয়ানদের বিজয় ও রোমানদের পরাজয়ঃ

সুরা আর-রুমের প্রথমেই তৎকালীন রোম সম্রাজ্য ও পারস্য সম্রাজের মাঝে যুদ্ধের ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। এই সুরাটি নাজিল হয় হযরত মুহাম্মদ (স:) এর নবুয়ত প্রাপ্তির ৫ বছর পর ৬১৫ খৃষ্টাব্দে, যখন যুদ্ধে পার্সিয়ানরা রোমোকদের উপর বিজয় লাভ করেছিল। হযরত মুহম্মদ (স:) এর নবুয়ত প্রাপ্তির ৮ বছর পূর্বে ৬০২ খৃষ্টাব্দে রোমান বাইজেনটাইন সম্রাট ছিলেন মরিস। এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন তারই সেনা প্রধান জেনারেল ফোকাস। শুরু হল ফোকাসের ধারাবাহিক হত্যাকান্ড। ফোকাস প্রথমেই ক্ষমতাচ্যুত রাজা মরিসের সামনেই তার ৫ পুত্রকে হত্যা করেন। তারপর খোদ রাজা মরিসকে হত্যা করেন এবং উন্মুক্ত রাস্তায় তাঁদের মাথা ঝুলিয়ে রাখেন। এখানেই তিনি ক্ষান্ত হন নি। কিছুদিন পর সম্ররাজ্ঞী ও তাঁদের তিন মেয়েদেরকেও একই কায়দায় নিষ্টুরভাবে হত্যা করা হয়।

উক্ত সময়ে ইরানের সাসানীয় সম্ররাট ছিলেন খসরু পারভেজ। এই হত্যাকান্ডের জন্য পারস্যের রাজা খসরু, রোমকদের বর্তমান স¤্রাট জেনারেল ফোকাসের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবার মনস্থির করলেন। কেননা খসরু এককালে ক্ষমতাচ্যুত সম্রাট মরিসের পৃষ্ঠপোষকতায় ইরানের সম্রাট হয়েছিলেন।

খসরুর সংগে ফোকাসের এ যুদ্ধ শুরু হয় ৬০৩ খৃষ্টাব্দে। তৎকালে সিরিয়া, জর্ডান, প্যালেস্টাইন ও এর আশে-পাশের এলাকা রোমক সম্ররাটের দখলে ছিল। যুদ্ধ শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই ফোকাসের সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। খসরু বাহিনী একদিকে তৎকালীন এশিয়া মাইনর (বর্তমান তুরস্কের দক্ষিন-পূর্বে অবস্থিত উরফা) এবং অন্য দিকে সিরিয়ার আলেন্দ্রো ও এন্টিয়স দখল করে নেয়।

রোমক বাইজেন্টাইন মন্ত্রীরা যখন দেখল ফোকাস তাঁদের দেশ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন, তখন তাঁরা আফ্রিকান গভর্নরের সহায়তা চায়। আফ্রিকান গর্ভনর হেরাক্লিয়াস দি এলডার তাঁর ছেলে হেরাক্লিয়াসকে তাঁদের সহায়তায় পাঠান। হেরাক্লিয়াস একটি শক্তিশালী নৌবহর নিয়ে ফোকাসকে আক্রমন করেন এবং তাঁকে হত্যা করেন। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ৬১০ সালে। (৬১০ সালের ১০ ই আগস্ট হযরত মুহাম্মদ (স:) নবুয়ত প্রাপ্ত হন)।

ফোকাস মৃত্যুবরন করেছে, খসরু পারভেজের ইচ্ছা পুরন হয়েছে। ফলে রোমক সম্রাট ও ইরানের সম্রাটের মধ্যে এ যুদ্ধ এখানেই থেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু যুদ্ধ থামে নি। ইরানের সম্রাট খসরু পারভেজ বর্তমান রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন এবং তিনি বর্তমান এ যুদ্ধের নাম দিলেন “জারোস্টারিয়ানিজম ও খৃষ্টীয়তার মাঝে একটি ধর্মযুদ্ধ”।

ইতিহাস স্বাক্ষী দেয় এই যুদ্ধে প্রায় ২৬০০০ ইহুদি, অগ্নিপূজক ইরান সম্রাটের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়। তাদের সংগে যোগ দেয় খৃষ্টানদের কর্তৃক নিপিড়িত ও বিতারিত নেষ্টেরিয়ান ও জেকবই সম্প্রদায়। বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে খসরু পারভেজ হেরাক্লিয়াসের বিরুদ্ধে যুদ্ধশুরু করে। তাঁরা ৬১৩ খৃষ্টাব্দে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক দখল করে নেয়। তারপর ৬১৪ খৃষ্টাব্দে জেরুজালেম দখল করে নেয়। জেরুজালেমে ইরানীয় খসরু বাহিনী ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। প্রায় ৯০,০০০ (নব্বই হাজার) খৃষ্টানকে হত্যা করা হয়। অগ্নিপূজক খসরু পারভেজ সম্রাট হেরাক্লিয়াসকে এক চিঠি লিখে পাঠায়, যার ভাষা ছিল এরকম “তোমার খোদার উপর যখন তোমার বিশ্বাস রয়েছে, তা’হলে তোমার খোদা আমার নিকট থেকে জেরুজালেমকে রক্ষা করতে পারছেনা কেন ?” ৬১৫ সালের মধ্যেই জর্ডান, প্যালেস্টাইন এর সিনাই উপত্যকা ও মিশরের সীমানা পর্যন্ত খসরু বাহিনীর দখলে চলে যায়।

৬১৭ সালের মধ্যেই ইরানীরা ইস্তাম্বুলের বসপরাস দখল করে নেয়। ৬১৯ সালের মধ্যে পুরো মিশর ও লিবিয়া দখল করে নেয়। বস্তুত ৮ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ ৬২২ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত চলে এমনি করে। এমকি সম্রাট হেরাক্লিয়াস পালিয়ে টিউনেশিয়া চলে যাবার মনস্ত করলেন।

অগ্নিপুজক পার্সিয়ানদের এমন বিজয়ে মক্কার মুসরিকরা অনেক আনন্দিত হয়। তারা মুসলিমদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে “ঐ দেখ ইরানের অগ্নিপূজারীরা জয়লাভ করেছে। খৃষ্টান নবুয়ত নাস্তানাবাদ হচ্ছে। এমনি করে আমরা (আরবের মূর্তি পূজারীরা) তোমাদের এবং তোমাদের ধর্মকে ধ্বংস করে দিব।”

আর তখনই এমন পরিস্থিতিতে ৬১৫ সালের দিকে মক্কায় সুরা আর-রুম নাযিল হয়। উক্ত সুরায় আল্লাহ তা’আলা বলেছেন রোমানরা পরাজিত হয়েছে, তাতে কি। শীঘ্রই তারা ইরানীদের উপর বিজয় লাভ করবে।এই সুরাতে দু’টি পূর্বাবাস দেয়া হয়েছে। প্রথমত: রোমানদের বিজয়, দ্বিতীয়ত: একই সময়ে মুসলিমদের বিজয়।মহান রাব্বুল আলামিন কর্তৃক নাযিলকৃত এই সুরার পূর্বাবাস প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছিল সুদুর পরাহত।

কিন্তু মক্কার মুসলমানদের মাঝে এ আত্মবিশ্বাস ছিল যে এই সুরার ভবিষ্যত বানী একদিন ফলবেই। ফলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) মুশরিক আবু জাহলের সাথে এ বলে বাজি ধরেন যে পাঁচ বছরের মধ্যে রোমানরা বিজয়ী হবেই। উক্ত বাজির কথা নবী (স:) জানতে পারলে বাজির সময় বাড়িয়ে দিতে বলেন। ফলে বাজি ৫ বছরের স্থলে ১০ বছর করা হল। বাজি হিসাবে দশ বছরের জন্য একশত উট ধরা হল।

রোমানদের ঘুরে দাড়ানো ও মুসলিমদের বিজয়ঃ

নবী (স:) ৬২২ খৃষ্টাব্দের ১৭ জুন, মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের জন্য বের হন। ২ জুলাই মদিনায় পৌছেন। আর অন্যদিকে স¤্রাট হেরাক্লিয়াস একই বছরে কৃষ্ণসাগর পাড়ি দিয়ে নিরবে ইস্তাম্বুল থেকে উত্তর-পূর্ব শহর ট্রাবজোন পৌছান। উদ্দেশ্যপিছন দিক দিয়ে ইরান আক্রমন করা। অবশেষে ৬২৩ খৃষ্টাব্দে হেরাক্লিয়াস আরমেনিয়া থেকে প্রতি-আক্রমন (কাউন্টার এটাক) শুরু করেন। তিনি ৬২৪ খৃষ্টাব্দে আজারবাইজান প্রবেশ করেন। তারপর তিনি ইরানী অগ্নি-উপাশকদের নবী জোরোয়াষ্টার এর জন্মভূমি ক্লোরোমিয়া প্রবেশ করে তাদের প্রধান অগ্নি-মন্দিরধ্বংস করে দেন।

আর অন্যদিকে একই বছর অর্থাৎ ৬২৪ খৃষ্টাব্দের ১৩ই মার্চ মুসলমানরা হযরত মুহম্মদ (স:) এর নেতৃত্বে আবু জাহিলের বিরুদ্ধে বদরের যুদ্ধে জয়লাভ করে। আর এর ফলে সুরা আর-রুমের ০২টি পূর্বাভাসই বাস্তবে রুপলাভ করে। ৬২৭ সালে নিনেভেইর যুদ্ধে রোমানরা ইরানের রাজধানীর ডান দিকে এগিয়ে তৎকালীন ইরানের রাজধানী  ষ্টেসিফোন দখল করে নেয়। ষ্টেসিফোন ইরাকের বাগদাদ থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিন-পূর্বে অবস্থিত। ৬২৮ খৃষ্টাব্দে একটি অভ্যন্তরীন বিদ্রোহে ক্ষমতাধর খসরু পারভেজকে কারাবন্দী করা হয়। তাঁর ১৮ সন্তানকে তারই সামনে হত্যা করা হয়। এর কিছুদিন পর তিনি নিজেও আত্মহত্যা করেন।

আর এই ৬২৮ খৃষ্টাব্দে মার্চে মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান হযরত মুহাম্মদ (স:) এর সহিত মক্কার কোরাইশদের সাথে হুদাবিয়ার সন্দ্বি হয়। এই হুদাবিয়ার সন্দ্বিতেও মুসলমানদের মধ্যে বিদ্রোহ ও ক্রোধ দেখা দিয়েছিল, কারন এর কিছু শর্তাবলী তারা পছন্দ করেন নি। কিন্তু মহান আল্লাতায়ালা হুদাবিয়ার সন্দ্বি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ৪৮নং সুরা আল-ফাতাহ এর প্রথমেই বলেছেন “নিশ্চই আমরা তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি”।

শুধু তাই নয় সম্রাট খসরু পারভেজের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে কোবাদ-২ সকল অধিকৃত এলাকা রোমানদের ফেরত দেয়। এর মধ্যে দিয়ে মক্কার মুশরিকরা বাজিতে হেরে যায় এবং হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) কে একশত উট দিতে বাধ্য হন। নবী (স:) সকল উট গরীব মুসলমানদের মধ্যে দান করার হুকুম দিলেন।

আরব-পার্সিয়ান যুদ্ধ ও মুসলামানদের ইরান বিজয়ঃ

এরই মধ্যে ইরানীদের সংগে আরবদের সম্পর্কের কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টানবী (স:) এর থেকেই প্রথম শুরু হয়। নবী (স:) হুদাবিয়ার সন্দ্বির পর অত্র এলাকার সকল সম্রাটের নিকট ইসলাম গ্রহনের জন্য পত্র প্রেরন করেন।

৬২৮ খৃষ্টাব্দে নবী (স:) তাঁর দূত আবদুল্লাহ বিন হুদাফা (রা:) কে ইরানের তৎকালীন সম্রাট খসরু ২ এর নিকট প্রেরন করেন। খসরু ২ প্রথমেই পত্রে মুহাম্মদ (স:) ও তাঁকে একই পর্যায়ে রাখার জন্য ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তারপর তিনি নবী (স:) কর্তৃক প্রেরিত পত্রটি টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলেন। এ কথা শোনার পর নবী (স:) বলে উঠলেন “ইয়া মাবুদ তাঁর রাজত্ব তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নাও।” আল্লাহ্ তাঁর এ দোয়া কবুল করেন। দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবন্ আল-খাত্তাফ এর আমলেইনবী (স:) এর এ ইচ্ছা পুরন হয়ে যায়।

এরই মধ্যে ৬৩২ খৃষ্টাব্দের ৮ জুন নবী (স:) ওফাত লাভ করেন। ৬৩৩ সালের উক্ত সময়ে অত্র এলাকায় তিনটি প্রভাবশালী শক্তির উদয় হয়। (১) সৌদি আরব এর আশে পাশের এলাকা নিয়ে রাশিদুন খিলাফত বা চার খলিফার শাসন, যারা ৩০ বছর শাসন ক্ষমতায় ছিলেন। এই খিলাফতের প্রথম খলিফা ছিলেন হযরত আবু বকর (রা:), (২) রাশিদুন খিলাফতের উত্তর ও উত্তর-পূর্বে সাসনীয় স¤্রাজ্য বা ইরান (৩) রাশিদুন খিলাফতের উত্তর-পশ্চিমে রোমক বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য।

ইরানীদের সংগে সর্বপ্রথম যুদ্ধ শুরু হয় প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা:) এর শেষ দিকে ৬৩৩ সালে। আসলে হযরত আবু বকর (রা:) এর আমলেই মুসলিমরা দু’টি ফ্রন্টেই যুদ্ধ করা শুরু করে, এর একটা হল রোমক বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য, আর অন্যটা ইরানী সাসনীয় সম্রাজ্য।

৬৩৩ সালে খালিদ বিন ওয়ালিদ পারস্য সম্রাটের অন্তর্ভুক্ত ইরাক আগমন করেন। কিন্তু খালিদ বিন ওয়ালিদ যখন রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সিরিয়ার দিকে যান, তখন ইরানীরা তাদের হারানো ভূমি পূনরূদ্ধার করে । ৬৩৪ সালে খলিফা আবু বকর (রা:) মৃত্যুবরন করেন।

খলিফা ওমর (রা:) তখন ক্ষমতায় । তিনি ৬৩৬ সালে সাদ ইবন্ আবি ওয়াকাস নেতৃত্বে ইরান আক্রমনের জন্য এক বিশাল সৈন্যদলপ্রেরণ করেন। এ যুদ্ধের নাম হল কুদিশিয়ার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ইরাকসহ ইরানীদের পশ্চিমাংশ মুসলিমদের পূর্ন দখলে আসে। এ সময়ে জাগরস পাহাড়ই ছিল আরব মুসলিম বাহিনী ও ইরানীদের মাঝে সীমান্ত রেখা। কিন্তু পার্শিয়ানরা মাঝে মাঝেই সীমান্ত অতিক্রম করে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমন করতে থাকে। এসব দেখে খলিফা ওমর (রা:) পুনরায় ইরান আক্রমনের হুকুম দেন। ৬২৪ সালে এ আক্রমন শুরু হয় এবং পরবর্তী ৯ বছরের মধ্যে ৬৫১ সালে খলিফা হযরত ওসমান (রা:) এর আমলে ইরান আরব মুসলিমদের পুর্ন করায়ত্ত্বে থাকে। ৬৫১ সালে ইরানীদের শেষ সম্রাট ছিলেন ইয়াজদেগার্ড-৩।

সৌদি-ইরান মতবিরোধের কারনঃ

এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হল ইরানীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলেও তাঁরা তাদের ভাষা ও কৃষ্টি কে কখনও ছেড়ে দিতে চায়নি। ফলে ইসলামের কিছুটা পরিবর্তীত রুপ ইরানে লক্ষ্যনীয়। ইরান পরিপূর্নভাবে ইসলামিক রাষ্ট্রে রুপান্তরিত হলেও আরব ও ইরানী সাসনীয়দের মাঝে মানসিক পার্থক্য ও দন্দ্ব সব সময়ই ছিল। এমন কি৬৪৪ সালে হযরত ওমর (রা:) কে যিনি হত্যা করেন তিনিও ছিলেন একজন ইরানী। তাঁর নাম ছিল পিরুজ নাহবন্দী।পার্সিয়ানরা তাঁদের দু’টো জিনিসকে কখনও ছেড়ে দেয় নি। সেগুলো হলো (১) তাঁদের ভাষা এবং (২) তাদের সংস্কৃতি ।

বর্তমানে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যে দন্দ্বটি চলছে সেটি শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ। মূলত: অতীতের সকল ইস্যু কে ভীত্তি হিসাবে রেখেদিয়ে বর্তমানেশিয়া-সুন্নি ইস্যুটিই প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রশ্ন আসতে পারে ইরানীরা কেন শিয়া মতাবলম্বী হল? ইরানীরা কিন্তু শুরুতেই শিয়া মুসলিম ছিল না। ১৫০২ সাল থেকে ১৭৩৬ সাল পর্যন্ত সাফাভিদ রাজবংশের শাসনামলে শিয়া মতের অভ্যুর্দয় হয়। সেই থেকে তারা শিয়া। তার অন্য আর কোন উপযুক্ত কারন নেই।

বর্তমানে ইরান ও সৌদি আরবের মাঝে একটি প্রক্সি যুদ্ধ চলছে। সৌদি আরব ইয়েমেনে প্রতিনিয়ত আক্রমন চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান সিরিয়া কে সাহায্য করে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে সৌদিরা আইএস কে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিয়া-সুন্নির আদলে এ যুদ্ধ দাবানলের মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে কোন যুদ্ধহলে তা হবে ইরানের মাটিতে। জবাবে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন দেহকান বলেছেন, সৌদি সরকার যদি বোকামী করে তাহলে পবিত্র নগরী মক্কা ও মদীনা বাদ দিয়ে গোটা সৌদি আরব ধ্বংস করে দেয়া হবে। সাম্প্রতিক আরব ইসলামিক - আমেরিকান (এআইএ) সম্মেলনে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরব সফর করেছেন। এই সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্যই নাকি শিয়াপন্থী ইরান, সিরিয়া, হেজবুল্লাহ ও হুতিদের ধ্বংস করা।

এসব কান্ড থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় ৬১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া আরব ও ইরানীদের মাঝে দন্দ্ব কখনও শেষ হবার নয়। আরব সমাজ ও ইরানীদের মাঝে প্রথা, কৃষ্টি ও ভাবাদর্শগত এই পার্থক্য থেকেই এই দন্দ্বের সৃষ্টি, যা কখনও এক হবার নয়। ভিতরে ভিতরে একটি আদর্শগত ক্ষোভ ও প্রতিশোধের স্পৃহা চলছে এই দুই সত্ত্বার মনে মনে।

সন্মানিতপাঠক এখন একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন, বর্তমানে সৌদি আরব খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংগে আছে। আর ইরানীরা আছে কমিউনিস্ট নাস্তিক রাষ্ট্র রাশিয়ার সংগে। এটা ইসলামের প্রারম্ভে শুরু হওয়া সেই দৃশ্যকল্পেরই বর্তমান প্রতিচ্ছবি মাত্র।

লেখক: বর্তমানে আর্মি ইন্সটিটিউট অব বিজনেস এ্যডমিনিষ্ট্রেশন, সিলেটে কর্মরত আছেন।