o নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি সিইসির নির্দেশ o রাজশাহীতে প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ, প্রচার-প্রচারণা শুরু o প্রশাসন ও আইসিটির প্রশিক্ষণে থাইল্যান্ড যাচ্ছেন কুতুবদিয়ার প্রধান শিক্ষক জহির o নড়াইলের দুটি আসনে ১২ প্রার্থীর প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন o শাহজাদপুরে বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পালিত

আজ সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ |

আপনি আছেন : প্রচ্ছদ  >  মতামত  >  মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল আমাদের অহংকার

মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল আমাদের অহংকার

পাবলিশড : ২০১৮-০৭-২০ ১০:২৫:০৩ এএম

।। রহিমা আক্তার মৌ ।।

গত ২০ জুলাই  ২০১৬ বুধবার গভীর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী শিরিন বানু মিতিল মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। পারিবারিক ভাবে জানানো হয়, রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিরিন বানু মিতিল গুরুতর অসুস্থ বোধ করলে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট নিয়ে যাওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি স্বামী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন।

স্বাধীনতার যুদ্ধে অনেক নারীই ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিজের বাঁচা-মরার কথা তখন তাদের মাথায় ছিল না। যেসব পরিবারগুলো আগে থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল তাদের পরিবারের মেয়েদের যুদ্ধে আসাটা কিছুটা হলেও সহজ ছিল। দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা আগে থেকেই জানতেন। পরিবারের আলোচনা থেকে শুনতেন। তেমনি এক পরিবারের মেয়ে ছিলেন শিরিন বানু মিতিল। পাবনা শহরের দিলালপুর মহল্লার খান বাহাদুর লজ- এএ ১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর পাবনায় খোন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ ও মা সেলিনা বানু দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহন করেন শিরিন বানু। 

১৯৭১ সাল। তখন তিনি পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী। শিরিন বানুর মা সেলিনা বানু ছিলেন বামপন্থী আন্দোলনের প্রথম সারির নেত্রী। বামপন্থী আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি ছিল তার নানার বাড়ি।২৫ মার্চ থেকেই পাবনায় প্রাথমিক প্রতিরোধ পর্ব শুরু হয়। যা চলে টানা ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। ২৫ মার্চ পাকবাহিনী ঢুকে পড়ে পাবনায়। কারফিউ জারি করে। ২৬ মার্চ থেকে রাজনৈতিক নেতাদেরকে গ্রেফতার শুরু হয়। নির্বিচারে হত্যা-নির্যাতন চালায় সাধারন জনগণকে। প্রতিবাদ করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় পাল্টা আঘাত হানার। ২৭ মার্চ শুরু হয় যুদ্ধ। যে যেভাবে পেরেছে নারী-পুরুষ সবাই যুদ্ধে অংশ নেয়। হাতের কাছে যে যা পেয়েছে তা নিয়েই নেমে পড়ে। আস্তে আস্তে সাধারন জনতার হাতেও অস্ত্র চলে আসে। একদিকে যুদ্ধ করা অন্যদিকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ। শিরিন বানুও সবার সাথে সাথে অস্ত্র চালানো শেখা শুরু করে। মাত্র আধা ঘন্টা সময়ে তিনি অস্ত্র চালানো শিখে ফেলেন।

 মেয়েদের যুদ্ধে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিপদও ছিল বেশি এই কারণে অনেকে মেয়েদের সাথে নিতে চাইতো না। শিরিন বানু নিজে শার্ট-প্যান্ট পড়ে রেডি হতেন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। তখন পোশাক দেখে মনেই হতো না তিনি নারী। ছেলেদের পোশাক পড়ে যুদ্ধে যাওয়া দেখে শিরিন বানু মিতিলের ছোট ভাই জিঞ্জির বলে,,,,,

-- "বুজি, প্রীতিলতার মতো তুমিও পারো ছেলেদের পোশাক পরে যুদ্ধে যেতে।"

 শিরিন বানু তাঁর খালার কাছেই থাকতেন বেশি। শার্ট-প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখে খালা রাফিয়া বানু বলেন,,,,,

-- "হ্যাঁ, এখন তুমি নিশ্চিন্তে যুদ্ধে যেতে পারো।"

২৮ মার্চ শহরের জেল রোডে টেলিফোন ভবনে দখলদার ৩৬ জন পাকিস্তানী সেনার সঙ্গে যুদ্ধ হয়৷ যুদ্ধে পাক সেনাদের সবাই মারা পড়ে৷ দু’জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন৷ এভাবে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলতেই থাকে৷ তখন যুদ্ধ চলছিল নগরবাড়ী ঘাট, আতাইকুলা ও কাশীনাথপুরে৷ পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয় আকাশপথে৷ পাশের জেলা কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ছে৷ তাদের বিভিন্ন দল পিছিয়ে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার দিকে৷ পাবনার ছাত্রনেতা ইকবালের দল একটি গাড়ীতে করে কুষ্টিয়া হয়ে চুয়াডাঙ্গার দিকে রওনা হয়৷ গাড়ীতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মিতিল ও তাঁর এক ভাই থেকে যায় কুষ্টিয়ায়৷ পরে কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গা যাওয়ার সময় ভারতীয় সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎ হয়৷ এরপর ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক মানস ঘোষ মিতিলের ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপেন৷

একদিনে তারা যখন কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গার দিকে যাচ্ছিলেন, তখন গভীর রাতে তাদের দলটিকে পথের মাঝে আটকানো হয়৷ মূলত ঐ অঞ্চলে পাক সেনাদের প্রতিরোধ করতেই সতর্কতামূলক পাহারায় যারা ছিল তারা মিতিলদের পরিচয় জানতে চায়৷ তারা পরিচয় দিলেও পাহারায় থাকা লোকেরা প্রথমে সেটা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না৷ কারণ তাদের সাথে যিনি আরআই ছিলেন তিনি ছিলেন পশ্চিম বঙ্গের৷ ফলে তাঁর ভাষার টান টা ছিল বিহারীদের মতো৷ তাই তারা যে সত্যি মুক্তিযোদ্ধা তার প্রমাণ চাইল৷ তখন পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাদের একজন বলতে বাধ্য হলো যে, ‘আপনারা কি আকাশবাণীতে শিরিন বানুর কথা শুনেছেন?’ তারা বলল যে, ‘হ্যাঁ, আমরা তাঁর কথা শুনেছি৷’ যখন তাদের বলা হলো যে, তাদের সাথে সেই শিরিন বানু আছে, তখনও দলের মধ্যে সন্দেহ যে, এতো বড় দলের ভেতরে ছদ্মবেশে একজন মেয়ে আছে, এটাকে তারা হয়তো অন্যভাবে দেখবে৷ কিন্তু মিতিলের পরিচয় জানার পরেই দেখা গেল যে, তারা সবাই তাকেই ঘিরে ধরল৷ তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ মিতিলের কাছে এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, ‘মা আমরা আর ভয় করি না৷ আমাদের মেয়েরা যখন আমাদের সাথে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে, তখন বিজয় আমাদের হবেই৷’ তাঁর এই কথা শুনে মিতিল খুব অবাক হয়েছিলেন এবং এ দ্বরা প্রমাণ হয়েছিল যে, সারাদেশের মানুষ কীভাবে স্বাধীনতার জন্য উদ্দীপনা ও উৎসাহ নিয়ে পরস্পরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ধরছিল৷”

শিরিন বানু চলে যান কলকাতার উপকণ্ঠে গোবরা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে দেখা হয় ইলা মিত্রের সাথে। সেখান থেকে যোগাযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সাথে। কয়েকজন নারীকে নিয়ে গঠিত হয় নারীদের ক্যাম্প। যার দায়িত্বে ছিলেন সাজেদা চৌধুরী, যিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রথম সারির একজন নেত্রী। ৩৬ জন নিয়ে গঠিত ক্যাম্পে নারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪০ জনে।

দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ায় পড়তে যান। সেখানকার পিপলস ফেন্ডশিপ ইউনিভারসিটি অব রাশিয়ায় নৃবিজ্ঞান বিষয়ে পড়া শেষে ১৯৮০ সালে দেশে ফেরেন তিনি। এর মধ্যে ১৯৭৪ সালে মাসুদুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

শিরিন বানু বেসরকারি সংস্থা পিআরআইপি ট্রাস্ট্রের ‘জেন্ডার অ্যান্ড গভার্নেন্স’ বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি চাইল্ড অ্যান্ড মাদার কেয়ার (সিএমসি) নামে একটি সেবাকেন্দ্রের সঙ্গেও বিশেষজ্ঞ হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ২০০৫ সালে ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী কমলা ভাসিনের নেতৃত্বে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত সহস্র সংগ্রামী নারীর যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশের ১৬ জনের মধ্যে শিরিনও বানুও ছিলেন।

 যুদ্ধের দিন সম্পর্কে শিরিন বানু মিতিল বলেন,,,,,,,

-- "অস্ত্রের অভাবে অনেক সময় আমাদের যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও আমাদের যুদ্ধ থেমে যায়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে আসি। বার বার চোখে ভাসে যুদ্ধের দিনগুলোর কথা, বাবার কথা। আমাকে ছেলের পোশাকে দেখে বাবা মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেছেন, তোমাদের আর ভয় নেই। আসলে আমাদের মনোবল আর প্রানশক্তিই আমাদের জয়ের মুখ দেখিয়েছে।"