o জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে প্রস্তুত নয় আওয়ামী লীগ o রাজশাহীতে কোমলমতি শিশুদের মরণ বোঝা ভারী স্কুল ব্যাগ o আবারো সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম o জঙ্গিবাদের উদ্ভব হয় এমন প্রতিষ্ঠান কখনই 'বিশ্ববিদ্যালয়' হতে পারে না o ২৮-২৯ অক্টোবর পরিবহন শ্রমিকদের সারাদেশে ধর্মঘটের ডাক

আজ শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ |

আপনি আছেন : প্রচ্ছদ  >  মতামত  >  ঢাকাই প্রতারণা ও একটি অভিজ্ঞতা

ঢাকাই প্রতারণা ও একটি অভিজ্ঞতা

পাবলিশড : ২০১৮-০৭-১১ ১০:৪২:২১ এএম

।। তুফান মাজহার খান ।।

প্রতারণা, ছিনতাই, লুটতরাজ হয় না এমন জায়গা খুব কমই আছে। মানুষ প্রায়ই শিকার হচ্ছে এসব অপ্রীতিকর ঘটনার। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এর প্রকোপটা একটু বেশি। আর রাজধানী ঢাকাতে এসব তো নিত্যদিনের ব্যাপার। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে যেন পরিবর্তন হচ্ছে প্রতারণা পদ্ধতিরও। কিছু অসাধু চক্র প্রতিনিয়তই অভিনব সব কায়দায় প্রতারণা করে যাচ্ছে সাধারণ মানুষদের সাথে। পত্রিকা খুললে প্রায়ই নতুন নতুন সব কায়দায় প্রতারণার ঘটনা দেখা যায়। তবে আজ আপনাদের একটি ব্যতিক্রম প্রতারণার গল্প শোনাব যা আমার খুব কাছের এক বন্ধুর সাথে ঘটে গেছে। সে আমাকে অনেকটা হাসিমুখেই ঘটনাটি বলছিল। কিন্তু ঘটনাটি শোনার পর রীতিমতো আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ঘটনাটি আমি তার ভাষায়ই বলছি-

কিছুদিন পূর্বে একটা কাজে ঢাকায় এসেছিলাম। কাজটা সারতে সারতে দুপুর গড়িয়ে যায়। সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে। তবে রোদ্রের উত্তাপ তখনো কমেনি। গরমের দিন হওয়ায় শরীর বেয়ে টপ টপ করে ঘাম ঝরছিল। ট্রেনে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে মতিঝিল থেকে কমলাপুরের পথে হাঁটতে লাগলাম। রাস্তাটা খুব দূরত্বের না। বড়জোর ১ কিলোমিটার বা তার খানিকটা বেশি হবে। তাছাড়া হাঁটতে আমার ভালো লাগে বিধায় প্রায়ই হাঁটি। তাই কোনো দ্বিধাবোধ না করেই হাঁটছিলাম। হেঁটে প্রায় এক থেকে দেড়শো মিটারের মতো যেতেই একটা বিষয় খেয়াল করলাম। মনে হচ্ছিল কেউ আমার পিছু নিয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই একজন ভদ্রলোককে দেখলাম। ভদ্রলোক না বলে উপায় নেই। ফরমাল ড্রেস আর কালো সু পরা অবস্থায় একটা লোককে কি ভদ্রলোক ছাড়া আর কিছু বলা যায়? যাইহোক, মনে শঙ্কা না নিয়ে আরও একটু এগিয়ে গেলাম। কিন্তু আবারও মনে খটকা লাগলো। পেছনে আবার তাকালাম। এবার একটু অবাক হলাম পেছনে একজন না, আরও একজন যোগ হয়েছে। তবে উনি ঠিক আগের ব্যক্তিটার পাশাপাশি না, একটু পেছনে আছেন। উনাকে দেখে খুব বোকাসোকা আর বিপদাপন্ন মনে হলো। হাতে আবার একটা কালো রঙের অফিস ব্যাগ। মনে হচ্ছিল প্রথমজন আমাকে কিছু বলতে চাইছে। আমি পাত্তা না দিয়ে সামনে এগুচ্ছিলাম। কিন্তু আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার পরও দেখলাম দুজন আমার দুই হাত পেছন পেছনই হাঁটছেন। এবার আমার পুরো সন্দেহ হলো। তবুও মনকে প্রবোধ দিলাম, হয়তো এরা কোনো কু-মতলব নিয়ে হাঁটছে না। হয়তো এরাও কমলাপুরের উদ্দেশ্যে হাঁটছে। আমি দাঁড়ালাম। উদ্দেশ্য ছিল এরা আমাকে ক্রস করে চলে গেলে তারপর আমি যাব। কিন্তু আমার মনে হলো আমি দাঁড়ানোয় এরা সুযোগটাকে লুফে নিল। দুজনই আমার দিকে ছুটে এলো। প্রথমজন আমাকে উদ্দেশ্য করে খুব নরম সুরে বললো, ভাই একটা কথা বলব? আমি বললাম, জ্বী বলুন। আমার কোনো ভয় হচ্ছিল না। কারণ ফুটপাত ধরে অারও অনেকেই হেঁটে যাচ্ছিল। উনি সেই বোকাসোকা লোকটাকে দেখিয়ে বললো, ভাই এই লোকটা নাকি খুব বিপদে পড়েছে। আমি বললাম, কী বিপদ? তিনি বললেন, উনার বাড়ি ঠাকুরগাঁও। উনার মানিব্যাগ পকেটমারে নিয়ে গেছে। এখন উনার বাড়ি যাওয়ার ভাড়াও নেই। আমি বললাম, ওহ্! কিছু টাকা সাহায্য করতে হবে তাইতো? উনি আমাকে হাত দিয়ে টান দিয়ে খানিকটা সরিয়ে নিয়ে কানের গোড়ায় ফিসফিস করে বললেন, উনার কাছে রেড পাউডার আছে। আমি বললাম, রেড পাউডার কী? তখনই ঐ বোকাসোকা লোকটা এগিয়ে এসে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো, রেড পাউডার হলো একটা দামি ইনজেকশনের কাঁচামাল। এ পাউডার থাইল্যান্ড থেকে আসে। আমি এর প্রসেসিং কোম্পানিতে চাকরি করতাম। কোম্পানিতে আমার কয়েকমাসের বেতন আটকে ছিল। তাই আসার সময় বেতন দিতে পারেনি বলে ম্যানেজারের সাথে ঝগড়া করে এগুলো নিয়ে এসেছি।

তারপর কালো ব্যাগটার চেইন খুলে আমাকে অনেকগুলো প্যাকেট দেখালো। আনুমানিক বিশটার মতো প্যাকেট হবে। আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু বুঝার তো আরও একজন আছে। উনি বললেন, আমার নাম আব্বাস। আমি বড় গাড়ি চালাই। স্ট্যান্ডেই আমি থাকি। প্যাকেটগুলো উনি বিক্রি করতে চায়। কিন্তু কোথায় বিক্রি করবে সেটা জানে না।

তারপর উনি আমার কানে ফিসফিস করে আবারও বললেন, আমি একটা দোকান চিনি। আপনি একটু উনাকে জিজ্ঞেস করেন যে, আমরা যদি এগুলো বিক্রি করে দিই তাহলে উনি আমাদের কত টাকা দিবেন।

আমি থতমত খেলাম। লোকটা বলে কী! একটা লোক বিপদে পড়েছে, এখন যদি তার একটু উপকার করতে পারি তাহলে এর জন্য আবার প্রতিদান চাইব কেন? আমি বুঝতেছিলাম কোনো একটা চক্রের খপ্পরে পড়েছি আমি। তবে আমিও এত সহজে ছাড়ার পাত্র নই। শেষটা দেখতে চাই। তাই আমিও অভিনেতা হয়ে গেলাম। আমি বললাম, এগুলোর তো দাম অনেক বেশি মনে হচ্ছে। তো আমরা যদি বিক্রি করে দিই আমাদেরকে কী দিবেন? 

বোকাসোকা লোকটা বললো, প্যাকেট কত করে বিক্রি করে দিবেন? আমি কিছুই বলতে পারলাম না। কারণ আমার তো এ সম্পর্কে আইডিয়া নেই। তবে আব্বাস নামের লোকটি বলে ওঠলেন, এক প্যাকেটের মূল্য তো পাঁচ হাজার টাকার বেশি হবে না। তাহলে সবগুলোর মূল্য মোট এক লাখ টাকার মতো হবে। 

আমি মনে মনে বললাম, বাহ্! কি সুন্দর নাটক সাজিয়েছে। মনে মনে দুটোকে পুলিশে দিব ভাবছিলাম। আশেপাশে কোনো কোনো পুলিশ নেই। তাই পুলিশ না পাওয়া পর্যন্ত ওদের সাথে অভিনয়টা চালিয়ে যেতে হবে। বোকা লোকটা বললো, ঠিক আছে এক লাখ টাকা বিক্রি করতে পারলে আপনাদের দুজনকে দশ হাজার টাকা দিব। আমিও তাল মিলিয়ে বলে ওঠলাম, না ভাই, আমাদের দুজনকে ৫০ হাজার দিতে হবে। উনি বললেন, না ভাই এত টাকা তো আমি দিতে পারব না। আচ্ছা যান, আমি ২০ হাজার টাকা দিব। 

আব্বাস সাহেব আমার দিকে সামান্য তাকিয়ে বললেন, আরে না, এত কমে আমরা পারব না। আর আমরা বিক্রি না করে দিলে আপনি নিজেও বিক্রি করতে পারবেন না। হয়তো অন্য কেউ নিয়ে যাবে অথবা পুলিশের হাতে ধরা পড়বেন। তখন এক টাকাও পাবেন না। গোপনে বেচতে হবে। আমাদের কথায় রাজি থাকলে বলেন। তা না হলে আমরা আসি। (আমার হাত ধরে টান দিয়ে একটু চলে যাওয়ার ভঙ্গি করলেন।) আমিও মাথা নাড়িয়ে সায় দিলাম আর পা বাড়ালাম।

বোকা লোকটি এবার কান্নাজড়িত কন্ঠে বললেন, ভাই আমাকে বিপদ থেকে বাঁচান। আমার কাছে বাড়ি যাওয়ারও পয়সা নেই। আচ্ছা, আপনারা যত চান ততই নিয়েন তবুও আমাকে উদ্ধার করেন। আব্বাস সাহেব এবার খুশি হয়ে বললেন, জানতাম তো রাজি হবেন, শুধু শুধু একটু কাহিনী করলেন আরকি। বোকা লোকটি বললেন, যাইহোক ভাই আমার মালগুলো বিক্রি করে দিন আব্বাস বললেন, ঠিক আছে চলুন। কোনো কথা বলবেন না।

আমিও আব্বাস সাহেবকে অনুসরণ করলাম। আমার পেছনে হাঁটছেন বোকা লোকটা। দ্রুতপায়ে হেঁটে প্রায় কমলাপুর স্টেশনের কাছে একটা গলির হাবিজাবি দোকানে নিয়ে গেলেন আব্বাস সাহেব। দোকানটা কবিরাজি ওষুধের দোকান বলে মনে হচ্ছিল। দোকানে অনেক রোগীও দেখা গেল। একজন বুড়া লোক রোগী দেখছেন। যাইহোক, আব্বাস সাহেব আমাদের বাইরে দাঁড় করে উনি এক প্যাকেট রেড পাউডার নিয়ে দোকানের ভিতরে ঢুকলেন। তবে বাইরে থেকে সবই দেখা যাচ্ছে। আব্বাসকে চেয়ারে বসা বুড়া লোকটির সাথে কথা না বলে একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য একজনকে প্যাকেটটা দেখিয়ে কথা বলতে দেখা গেল। প্যাকেট দেখে লোকটার চোখ যেন চকচক করে ওঠল। মনে হলো অনেক দুর্লভ কিছু পেয়ে গেছেন।

আমাকে ঐদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা বোকা লোকটি বললেন, ভাই আপনাকে দেখে খুব ভরসা পাচ্ছি। আপনি একটু টাকাটা নিজ হাতে আমাকে নিয়ে দিয়েন যাতে আমাকে ঠকাতে না পারে।

আমি বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি টেনশন করবেন না।

উনি খুশি হলেন। দোকানের ভেতরে তাকাতেই দেখি এক হাজার টাকার বেশ কয়েকটি নোট আব্বাস সাহেবের হাতে তুলে দিচ্ছেন লোকটা। আব্বাস সাহেব কথা শেষ করে ফিরে এলেন। এসে আমাদের নিয়ে মেইন রাস্তার ফুটপাতে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমাকে টান দিয়ে ঐ লোক থেকে একটু সাইডে নিয়ে আবারও ফিসফিস করে বললেন, এটা আমার এক বন্ধুর ভাইয়ের দোকান। দোকানে কথা বলে দেখলাম, উনারা প্রতি প্যাকেট ছয় হাজার টাকা করে দিবে। এটা কিন্তু আবার উনাকে বলবেন না। আর চলুন, উনার কাছ থেকে মাল রেখে উনাকে বিদায় করে দিই। উনি থাকলে আবার টাকা নিতে সমস্যা হবে। আমি বিশ হাজার টাকা এডভান্স নিয়ে এসেছি। আপনার কাছে কত আছে? পকেটে একশো টাকার দুটো নোট ছাড়া আর কিছু নেই। তবু বললাম, আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকা আছে। আর এটা করা কি ঠিক হবে? উনি তো এমনিতেই আমাদের পঞ্চাশ হাজার টাকা দিচ্ছেন।

আব্বাস সাহেব বললেন, আরে ভাই আমরা উনাকে যত কমে বিদায় করতে পারি ততই তো লাভ! আর ভয় পাবেন না। আপনার কাছে কী কী আছে দিন। আমি বললাম, কী কী আছে মানে? উনি বললেন, আরে ভাই টাকা, মোবাইল যা যা আছে দিন। আমিও আমার মোবাইল, টাকা সব দিচ্ছি। বিশ হাজার টাকা তো আর উনি নিবে না। আমি বললাম, না ভাই। টাকা, মোবাইল এগুলো কেন দিব? তারচেয়ে বরং আপনি প্যাকেটগুলো বিক্রি করে তারপর উনাকে বিদায় করুন। 

উনি বললেন, তাতে তো আমাদের লস হচ্ছে, বুঝেন না কেন? আর মোবাইল, টাকা তো শুধু আপনি দিচ্ছেন না, আমিও দিচ্ছি। আমি বললাম, না ভাই। আমি দিব না। উনি এবার একটু রেগে বললেন, আরে দিন তো, এক্ষুণি প্যাকেটগুলো বিক্রি করে আপনার ভাগের সব টাকাও দিব আর নতুন মোবাইলও কিনে দিব, সমস্যা নাই।

মনে মনে ভাবলাম, বড় ধান্ধাবাজেই তো পেয়েছে আমাকে। আশেপাশে কোনো পুলিশ নেই। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। সামনে অবশ্য একজন ট্রাফিক পুলিশ দেখা যাচ্ছিল।

আমি কায়দা করে বললাম, ঠিক আছে একটু ছায়ায় আসুন। এ কথা বলে তাদের ট্রাফিক পুলিশটার কাছাকাছি গেলাম। এবার পকেট থেকে মোবাইল বের করার ভান করে জোরে ট্রাফিক ভাই বলে চিৎকার দিলাম। আর দুইজনের দুই হাতে খপ করে ধরে ফেললাম। অবস্থা বুঝতে পেরে বোকা লোকটা তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট ছুরি বের করে আমার হাতে ঘা মারল। আমি আর ধরে রাখতে পারলাম না। দুইজন ছুটে দুই দিকে দৌড় দিল। ট্রাফিক পুলিশ খানিকটা দৌড়ে ওদের তাড়া করল কিন্তু মুহূর্তেই এরা গাড়ির ভীড়ে হারিয়ে গেল। তারপর ট্রাফিক পুলিশ আমার কাছে এলে ঘটনা খুলে বলি। পুলিশ পকেট থেকে টিস্যু পেপার বের করে বললেন, রক্ত পড়ছে, চেপে ধরুন।

ভাগ্যিস সামান্য আঘাত লেগেছে, তাও আবার হাতে। যদি পেটে ছুরিটা বসিয়ে দিত। ওহ্!

দোকানটা কাছে হওয়ায় পুলিশ বললেন, চলুন তো দেখি। কিন্তু ওখানে গিয়ে আর ঐ লোকটাকে পাওয়া গেল না, যিনি আব্বাসকে টাকা দিয়েছিলেন। বুঝতে পারলাম উনিও তাদের দলের লোকই ছিল। কবিরাজকে জিজ্ঞেস করলে তিনি নিজেও এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারলেন না। রোগী দেখার চাপে হয়তো এসব তিনি খেয়ালই করেননি। পুলিশ আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, এমন বোকামি করবেন না কখনো। এদের থেকে সাবধানে থাকবেন। পারলে ন্যাশনাল হেল্প ডেস্ক ৯৯৯ তে কল দিবেন। 

আমি বললাম, জ্বী। আর কোনো কথাই বের হলো না মুখ দিয়ে। শুধু মনে মনে বললাম, আহা কি নাটকীয় জীবন!

লেখকঃ প্রাবন্ধিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক